কোভিড টিকা নিয়ে সাম্প্রতিক সংবাদ


ডাঃ জিন্নুরাইন জায়গীরদারঃ কোভিডের টিকা এখন বিশ্বের অন্যতম সু-সংবাদ, এটাকে বলা হচ্ছে গেইম চেঞ্জার অর্থাৎ টিকা, কোভিডের খেলা বদলে দিয়েছে। মহামারিকে রুখে দেবার জন্য সফল টিকার ভূমিকা অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক এবং বৈজ্ঞানিক সফলতার অন্যতম ভিত্তি। টিকা বাজারে আসার আগে কোভিডের চিকিৎসা তেমন সফলতা দেখাতে পারেনি। লক ডাউন, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এগুলো সাময়িক সফলতা দেখালেও, বিশ্ব অর্থনীতিকে ভয়াবহ চাপে ফেলে দিয়েছে, জনজীবন বিপর্য্যস্ত। তাই টিকাকে দেখা হচ্ছে আশার একমাত্র প্রতীক হিসেবে।

এই মুহূর্তে টিকা নিয়ে বিশ্ব তিনটি ভাগে বিভক্ত;

প্রথম ভাগ হচ্ছে রাশিয়া; রাশিয়া তাদের গামালিয়া ইন্সটিটিউটের টিকা, স্পুটনিক ভি, গবেষণার তৃতীয় স্তর শুরুর আগেই ১১ই আগস্ট ২০২০ সরকারি অনুমোদন দিয়ে বিশ্বে টিকার রাজ্যে প্রথম ২রা ডিসেম্বর ২০২০ গণটিকা প্রদান কর্মসূচী শুরু করে, ইতিহাসে নাম লিখালো। এই টিকার তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা শুরু হয় সেপ্টেম্বরে আর এই পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল গত ২রা ফেব্রুয়ারি ২০২১ ল্যান্সেটে প্রকাশিত হয়েছে। ৩১ হাজার স্বেচ্ছাকর্মিকে পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, ফলাফলে দেখা যায় এই টিকা ৯১.৬% কার্য্যকর। রাশিয়া ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ভেনিজুয়েলা ও বেলারুশে এই টিকার তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা চলছে। মধ্য জানুয়ারি পর্য্যন্ত রাশিয়ায় ১৫ লক্ষ মানুষকে এই টিকা প্রদান সম্পন্ন করা হয়েছিলো। ইতিমধ্যে রাশিয়ার বাহিরে অন্তত ১৭টি দেশে এই টিকা অনুমোদিত হয়েছে, দেশগুলোর মধ্যে, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইরান, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং পাকিস্তান অন্যতম। এই টিকার মূল এডেনোভাইরাস ভেক্টরের মধ্যে কোভিডের স্পাইক প্রোটেইন ঢুকিয়ে ইমিউন সিস্টেমকে কার্য্যকর করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে চীন; দেশটি তাদের সরকারি ভ্যাক্সিন ফার্ম, সাইনোফার্ম নামক টিকার প্রথম ডোজ ইতিমধ্যে ২ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষকে দেয়া সম্পন্ন করেছে। রাশিয়ার মত চীনও, পরীক্ষা নিরীক্ষার তৃতীয় স্তর শুরুর আগেই সরকারী অনুমোদন দেয় ২৮শে আগস্ট এবং জনগণের জন্য ব্যাবহারের অনুমোদন দেয় ৩১শে ডিসেম্বর ২০২০, তারা তাদের টিকার কার্য্যকারিতা পেয়েছে ৭৯%। চীন ৪০ কোটির বেশী টীকা তাদের দেশের বাহিরে পাঠাচ্ছে এর মধ্যে ১২ কোটীর বেশী টিকা কিনেছে ইন্দোনেশিয়া। পাকিস্তানকে কয়েক কোটী টীকা বিনে পয়সায় দিচ্ছে চীন। এছাড়া আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও চীন টিকা সরবরাহ করছে। চীনের সাইনোফার্মের টিকা ছাড়াও আরও কমপক্ষে ৪টি টিকা বাজারে আসার অপেক্ষায়, এর মধ্যে সাইনোভ্যাক এবং ক্যান্সাইনো অন্যতম। চীনের সাইনোফার্মের টিকা পুরনো প্রচলিত পদ্ধতি, মৃত অথবা জীবন্ত কর্মক্ষমতাহীন ভাইরাসকে শরীরে প্রবেশ করিয়ে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে কার্য্যকর করা হয়।

তৃতীয় ভাগ হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব; পশ্চিমা বিশ্বে প্রথম পরীক্ষা শুরু করে ফাইজার-বায়োনটেক ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখে। ৯ই নভেম্বর প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করলে এর ৯০% কার্য্যকারিতা দেখা যায়, পরবর্তিতে এর কার্য্যকারিতা ৯৫% বলে প্রকাশিত হয়েছে। এই ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ২রা ডিসেম্বর  ২০২০, যুক্তরাজ্য সরকার প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়ে মার্গারেট কিগান নামক ৯২ বছরের মহিলাকে প্রথম টিকা দিয়ে, গনটিকা কর্মসূচী শুরু করে।পশ্চিমা বিশ্বের জন্য ২রা ডিসেম্বর একটি ঐতিহাসিক দিন। এর পর ৯ই ডিসেম্বর ক্যানাডা, ১১ই ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র এবং ২১শে ডিসেম্বর ই ইউ এই টিকাকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়ে গনকর্মসূচি শুরু করে। ফাইজার বায়োনটেকের টিকা একটি সম্পূর্ন নূতন পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে যাকে বলা হয় এম আর এন এ পদ্ধতি। এই টিকা দিয়েই যুক্তরাজ্য টিকা প্রদান শুরু করে, তারপর মোডার্না এবং এস্ট্রাজেনেকার টিকা মিলে ইতিমধ্যে যুক্তরাজয় ১ কোটির বেশী মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে দেয়া হয়েছে ২ কোটী ৬০ লাখের বেশী ডোজ। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও টিকা প্রদান চলছে দ্রুত গতিতে।

ফাইজার বায়োনটেকের টিকার পাশাপাশি এসেছে মডার্নার টিকা। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মোডার্না কোম্পানিও ফাইজার বায়োনটেকের মত এম আর এন এ পদ্ধতি ব্যাবহার করেছে। তারা ২০২০ সালের জুলাই মাসে পরীক্ষা শুরু করে আর জরুরী ব্যাবহারের অনুমোদন পায় যুক্তরাষ্ট্রে ডিসেম্বর মাসের ১৮ তারীখ, ২৩শে ডিসেম্বর ক্যানাডা, ৬ই জানুয়রি ই ইউ আর ৮ই জানুয়ারি যুক্তরাজ্য এই টিকার অনুমোদন দিয়ে ব্যাবহার শুরু করে দিয়েছে।

এরপর এসেছে বহুল প্রতীক্ষিত এবং আলোচিত অক্সফোর্ডের (এস্ট্রাজেনেকা) টিকা। এই টিকার সফলতার সংবাদ আসে ২৩শে নভেম্বর ২০২০ এবং প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায় এই টিকার  কার্য্যকারিতা ৭০%। এস্ট্রাজেনেকা/অক্সফোর্ডের জন্য এটা ছিল প্রথম একটি ধাক্কা। ফলাফলে সংশয় দেখা দেয় কারণ, যারা পুরো ডোজ (২) পেয়েছিলেন তাদের কার্য্যকারিতা ছিল ৫৯% আর যারা ভুলক্রমে প্রথম ডোজে অর্ধেক আর ২য় ডোজে পুরো পেয়েছেন তাদের কার্য্যকারিতা ছিল ৯০%। এই দুই ফলাফলকে যোগ করে গড় হিসেব করে চূড়ান্ত ফলাফলে কার্য্যকারিতা ৭০% দেখানো হয়েছে, তবে এখানে সমস্যা আছে, যারা অর্ধেক ডোজ পেয়েছিলেন তারা সকলেই ছিলেন ৫৫ বছরের কম বয়সের। এছাড়া অক্সফোর্ডের প্রতীক্ষায় ৬৫ বছরের উর্ধে তেমন কোন সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন না।

এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাক্সিন যুক্তরাজ্যের অনুমোদন পায় ৩০শে ডিসেম্বর ২০২০, ভারতের অনুমোদন পায় ২রা জানুয়ারি ২০২১ আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনুমোদন পায় ২৯শে জানুয়ারি। যুক্তরাজ্য জোরে শোরে টিকা প্রদান কর্মসূচি শুরু করে প্রতিদিন ৬-৭ লাখ ডোজ টিকা প্রদান করে ইতিমধ্যে ১ কোটী মানুষকে টিকার প্রথম ডোজ প্রদান করেছে।

দ্বন্দ্ব এবং সংশয়: ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে এস্ট্রাজেনেকা যে চুক্তি করেছিলো সেই চুক্তি অনুসারে সময়মত টিকা প্রদান করতে পারবেনা জানালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া প্রদর্শিত হলে নূতন সমঝোতা হয়েছে।

তারপর এসেছে নূতন ধাক্কা, আর তা হচ্ছে জার্মানী জানিয়ে দিয়েছে এই টিকার তৃতীয় স্তরের পরীক্ষায় যেহেতু ৬৫ বছরের উপরে সুরক্ষা প্রমাণিত হয়নি তাই তারা এই টিকা ৬৫ বছরের উপরের জনগোষ্ঠীকে প্রদান করবেনা। একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স। এদিকে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিহল মার্টিন জানিয়েছেন তারা এই টিকা ৭০ বছরের উর্ধে যাদের বয়স তাদেরকে না দিয়ে অন্যদের দেবেন আর ৭০ বছরের উর্ধে যাদের বয়স তাদের জন্য ফাইজার কিংবা মোডার্নার টিকা ব্যাবহার করা হবে। আগামী সপ্তাহেই এস্ট্রাজেনেকার ৪ লক্ষ ডোজ টিকা আয়ারল্যান্ড এসে পৌছার কথা রয়েছে।

এর মধ্যে গতকাল এস্ট্রাজেনেকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, অক্সফোর্ডের ভ্যাক্সিন প্রথম ডোজ দেবার পর ৩মাস সুরক্ষা দেবে ৭৬% মানুষকে আর যারা এই ভ্যাক্সিন নেবেন তারা সংক্রমণ প্রতিরোধ করবেন ৬৭% শতাংশ আর ৩ মাসের মাথায় ২য় ডোজ নেবার পর কার্য্যকারিতা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৮২.৪%। যদিও এই ফলাফল এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। এস্ট্রাজেনেকার এই ফলাফলে এসেছে একটি নূতন সংযোজন আর সেটা হচ্ছে টিকা নেবার পর ৬৭% মানুষের শরীরে আর ভাইরাস থাকবে না আর তারা অন্যদের সংক্রমিত করবেন না। এটা সত্যি নূতন ইতিবাচক সংবাদ। ফাইজার কিংবা মোডার্না এখনো এই ধরনের কোন পরীক্ষা চালিয়েছে কি না জানা যায়নি।

যদিও এস্ট্রাজেনেকার নূতন ফলাফল ছিল ইতিবাচক কিন্তু গতকাল সুইজারল্যান্ড এস্ট্রাজেনেকার টিকাকে অনুমোদন দেবেনা বলে জানিয়ে দিয়েছে। তারা বলেছে অক্সফোর্ডের ৩য় স্তরের পরীক্ষা এবং ফলাফলের যে সকল তথ্য উপাত্ত জমা দিয়েছে সেগুলো অনুমোদনের জন্য যথেষ্ট নয় তাই তারা আপাততঃ অনুমোদন দেয়নি  আরও তথ্য উপাত্ত চেয়েছে। এটা এস্ট্রাজেনেকা টিকার জন্য একটি বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।
 
উপসংহারঃ বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারি জনজীবন বিপন্ন করে দিয়েছে। আশা করা গিয়েছিলো টিকা আসলে সারা বিশ্ব সভ্যতা সুরক্ষিত হবে, টিকা এসেছে, আশা এখনো জাগরূক আছে কিন্তু টিকা বাণিজ্য আর টিকা রাজনীতি জনমানুষকে সংশয়ের দোলাচলে ফেলে দিয়েছে। ফাইজার বায়োনটেক আর মোডার্নার টিকা যেমন সোজাসাপটা ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে এসেছিলো অক্সফোর্ডের এস্ট্রাজেনেকার টিকা মিশ্র ফলাফল, তথ্য উপাত্তে গরমিল নিয়ে এসে ইউরোপে সংশয় তৈরী করেছে। বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স আর আয়ারল্যান্ড ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা হলেও সংশয় তৈরি করেছিলো কিন্তু গতকাল সুইজারল্যান্ড অনুমোদন প্রদানে অনীহা প্রদর্শন করে ভীষণ বিপদেই ফেলে দিয়েছে।

মন্তব্যঃ আমাদের সকলের জন্য টিকা রাজনীতি আর টিকা ব্যাবসা কোন সংবাদ নয়। আমরা বিশ্বাস আর নির্ভরশীলতা নিয়ে যে টিকাই আসুক না কেন সেটা গ্রহণ করে বিশ্ব সভ্যতাকে সুরক্ষিত করতে বদ্ধ পরিকর থাকবো। টিকা বাণিজ্য বন্ধ করা গেলে সেটা মানবজাতির জন্য আরও কল্যাণ বয়ে আনত। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে  তৈরি এস্ট্রাজেনেকার টিকার ৭০ লক্ষ ডোজ পেয়েছে, এর মধ্যে ২০ লক্ষ ডোজ উপহার হিসেবে আর ক্রয় করা ৩ কোটী ডোজের প্রথম চালান ৫০ লক্ষ ডোজ পেয়ে গিয়েছে এবং টিকা প্রদান অব্যাহত আছে। আমরা আশা করি বাংলাদেশে টিকা নিয়ে অপরাজনীতি আর বাণিজ্য বন্ধ রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর থাকবে। আমরা জানি বাংলাদেশ অতীতে ই পি আই কর্মসূচী গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়িয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার টিকা প্রদান কর্মসূচী সফল করে তুলে মহামারিকে পরাস্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। 

SHARE THIS ARTICLE