প্রেক্ষাপটঃ স্বাস্থ্যকর্মী

ডাঃ জিন্নুরাইন জায়গীরদার: বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এর থাবায় বিপুল সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। অনেকের জীবনহানি হয়েছে। আমার বন্ধু ডাঃ শামীম আল মামুন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। অগ্রজ, অনুজ বেশ কয়েকজনের জীবনাবসান হয়েছে।

আমরা সকলের এই আত্নত্যাগকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরন করছি এবং নূতন জীবনে তাদের শান্তি প্রার্থনা করছি। মহামারীর এই দুঃসময়ে, চিকিৎসা পেশায় জড়িত সকলের সুস্থ থাকা এবং তাদের সুস্থ রাখা অত্যাবশ্যক। একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে বিশেষ করে বাংলাদেশে আমার চিকিৎসক ভাই-বোনদের বিপুল সংখ্যায়, আক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে কিছু অভিজ্ঞতা এখানে শেয়ার করা দায়িত্ব মনে করছি।

করোনার সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে আমার আজ ৬৭ দিন চলছে। প্রথম দিন থেকে আজ অবধি আমরা আমাদের টিমের প্রতিটি সদস্যকে ব্যাক্তিগত সুরক্ষার প্রতিটি পদক্ষেপ শিক্ষা প্রদান করে আসছি। সেই হিসাবে আমাদের সাথে চিকিতসক যারা আই সি ইউ তে কাজ করছেন তাদের কেউই এখন পর্য্যন্ত আক্রান্ত হন নি। কয়েকজন নার্স আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের সবাই এখন সুস্থ আছেন।

স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে আমাদের সকলেই অবগত থাকা আবশ্যিক যে, কোভিড-১৯ সংক্রমনের পথগুলো কি কি? এই প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে জানা থাকলে আমরা নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবো। আয়ারল্যান্ড এর প্রেক্ষাপট আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনেক ভিন্ন। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড একটি দ্বীপরাষ্ট্র, আয়তনে বাংলাদেশের অর্ধেক আর জনসংখ্যা মাত্র ৫০ লক্ষ। সেই হিসাবে বাংলাদেশ একটি ব্দ্বীপ রাষ্ট্র, জনসংখ্যা আয়তনের অনুপাতে আয়ারল্যান্ডের ১৬ গুণ। তাই ওখানে অতিরিক্ত সাবধানতা আবশ্যিক।

কোভিড-১৯ সংক্রমনের পথগুলোঃ
১। কন্টাক্ট (ছোয়াছুয়ি)
২। ড্রপলেট (জলীয় ফোটা): যা শুধুমাত্র হাচি, কাশি, প্রশ্বাস আর কথার মাধ্যমে ছড়ায়।
৩। এরোসোল জেনারেশন (গতি সম্পন্ন বড় এবং ছোট জলীয় ফোটার): যা শুধুমাত্র যারা শ্বাসনালী নিয়ে কাজ করেন অর্থাৎ নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন, হাই ফ্লো নেজাল অক্সিজেন কিংবা এন্ডট্রাকিয়াল ইন্টিউবেশন এধরনের কার্য্যের মাধ্যমে ছড়ায়।

কন্টাক্ট ট্রান্সমিশন এর ব্যাপারে আমরা অনেকেই ভেবে দেখিনা। আমি এই ব্যাপারে পুরো সাইকেল ব্যাখ্যা করতে চাই। বাসা থেকেই একটি মাস্ক (কাপড়ের কিংবা মেডিকেল) পরে নেয়া উত্তম বলে মনে করি, যা আমাকে অন্যের হাচি, কাশির ড্রপলেট থেকে সুরক্ষা দেবে। সেই সাথে একটি এলকোহল সেনিটাইজার সাথে রাখা উত্তম।

নিজস্ব বিদ্যায়তন হিসেবে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কর্মস্থল জ্ঞান করে আমি আমার বাসা হাউজিং এস্টেট থেকে বের হয়ে যখন রিক্সায় কিংবা অটোতে উঠি তখনই আমি প্রথমে ভাইরাসের কন্টাক্টে যাবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কেননা আমাকে মনে রাখতে হবে আমার আগের পেসেঞ্জার রিক্সার প্রতিটি স্থানে ভাইরাস রেখে যাবার সম্ভাবনা আছে। তাই ব্যাক্তিগত বাহন এক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপদ। রিক্সাতে উঠেই আমার উচিত হবে সাথে রাখা এলকোহল সেনিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া। বারে বারে এই হাত ধোয়া অতীব প্রয়োজনীয় কেননা আমরা প্রতিনিয়ত অবচেতনে আমাদের নাকে, চোখে, মুখে কিংবা কপালে হাত দিয়েই ভাইরাস কন্টাক্ট করে থাকার ঝুকি বাড়িয়ে দেই।

রিক্সা থেকে নেমে করিডোর দিয়ে হেটে যাবার সময় শারিরীক দূরত্ত্ব বজায় রাখা আবশ্যিক। যেহেতু দেশে জনসংখ্যা বেশী, আমার আগের হেটে যাওয়া মানুষের প্রশ্বাস কিংবা হাচি কিংবা কাশি হয়তবা ড্রপলেট রেখে গিয়েছে তাই এক্ষেত্রে মাস্ক আমাকে সুরক্ষা দিতে পারে। এর পর লিফটের সুইচে হাত দিয়ে ভাইরাস কন্টাক্ট করে থাকতে পারি, তাই সাথে রাখা এলকোহল সেনিটাইজার দিয়ে আবার হাত প্রক্ষালন করে নেয়া উত্তম। লিফট পারতপক্ষে ব্যাবহার না করাই উত্তম কেননা আমার আগে যিনি গিয়েছেন তিনি ড্রপলেট এবং কন্টাক্ট দুটোই রেখে গিয়ে থাকতে পারেন।

উপরে উঠে রুমে গিয়ে আমি আমার ধোয়া এবং ইস্ত্রি করা এপ্রোন গায়ে দিতে চাই, নিজের শরীরকে ড্রপলেট থেকে বাচানোর জন্য। এর পর আমি আবার হাত ধুয়ে নেবো কেননা আমার দরজার হাতল কিংবা টেবিলের উপর ভাইরাস লেগে কন্টাক্ট হয়ে থাকতে পারে।

আমার আজকের এই আলোচনা শুধুমাত্র কোভিড-১৯ সন্দেহজনক নয় এমন রোগীর বেলায় প্রযোজ্য হবে। কোভিড সন্দেহ হলে অবশ্যই আমাদেরকে বিশেষায়িত সুরক্ষার ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে।
এরপর আমি আউটডোরে কিংবা ওয়ার্ডে রোগী দেখতে যাচ্ছি। আমাকে মনে রাখতে হবে প্রতিটি সুস্থ কিংবা অসুস্থ ব্যাক্তিই ভাইরাসের বাহক। তাই ২ মিটার দূরত্ত্ব বজায় রেখেই কথা বলবো। যদি সম্ভব হয় গ্লাস ব্যারিয়ার ব্যাবহার করা যেতে পারে।

এরপর, আমি যখন রোগীকে পরীক্ষা করতে যাবো, রোগীকে একটি মাস্ক পরিয়ে নেবো এবং ভালো করে হাত ধুয়ে একটি ডিস্পোজেবল গ্লাভস হাতে পরে নেবো। পা, হাত, বুক, পেট পরীক্ষা শেষে অবশ্যই গ্লাভস টি সঠিক পদ্ধতিতে খুলে সঠিক স্থানে ফেলে হাত ধুয়ে নেবো। স্টেথোস্কোপ ভালো করে এলকোহল ওয়াইপ দিয়ে পরিষ্কার করবো। যদি কোন কারনে মুখ কিংবা নাক পরীক্ষা করতে হয় তাহলে অবশ্যই আমাকে একটি রেস্পাইরেটার মাস্ক (এন-৯৫ কিংবা এফ এফ পি-৩/৪) মাস্ক সঠিক ভাবে পরিধান করে ফিট টেস্ট করে নিতে হবে। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগে এপ্রোন খুলে লন্ড্রিতে ধুতে দিতে হবে।

বাসায় ঢোকার আগে আমি আমার জুতা খুলে বাহিরে রেখে সরাসরি গোসল করতে যাবো। শরীরের কাপড় খুলে ওয়াশিং মেশিনে সাবান দিয়ে ন্যুনতম ৯৫ ডিগ্রিতে ধুয়ে নেবো। পুরো শরীর সাবানের ফেনা তুলে ভালো করে ১৫-২০ মিনিট উষ্ণ পানি ঢেলে স্নান সমাপন করবো। বিশেষ করে নাকের ভিতর পানি দিয়ে বারে বারে ধুয়ে নেবো। সাবানের ফেনা তুলে মুখ, কান ঘাড়, মাথা, কপাল সবই ভালো করে ধুয়ে নূতন পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে পরিবারের সাথে গল্প এবং খাবার খেয়ে বিশ্রামে যাবো।

আমি মনে করি এটাই একজন সাধারন চিকিতসকের রুটিন হওয়া উচিত। সাধারন ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কন্টাক্ট এবং ড্রপ্লেট থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি চক্র আমি লিখেছি। যারা বিশেষ ক্ষেত্রে অর্থাৎ কোভিড-১৯ হাসপাতাল কিংবা আই সি ইউ তে কাজ করেন তাদের জন্য এর অতিরিক্ত এরোসল থেকে নিজেকে সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যাবস্থা আবশ্যিক। সেই ব্যাপারে পরবর্তীতে আলোচনার প্রত্যাশী।

আমাদের পর্যবেক্ষন হলো, বেশীরভাগ স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন কোভিড হাসপাতালে কাজের মধ্য দিয়ে নয়। বাংলাদেশে যেহেতু কোভিড হাসপাতাল ভাগ করা হয়েছে তাই অনেকেই ভাবছেন নিজের কর্মস্থলে কোভিড নেই। এটা একটা মারাত্নক ভ্রম, কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ কিংবা প্রি-সিম্পটোমেটিকরা অজান্তে ভাইরাস নিয়ে যত্র তত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাই আমাদেরকে প্রতিটি স্থান যেমন টেবিল, চেয়ার থেকে শুরু করে দেয়াল, বিছানা প্রতিটি পৃষ্ঠতলকে ড্রপলেট আক্রান্ত ভেবে বারে বারে হাত ধুয়ে সংক্রমনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। মনে রাখতে হবে একবার হাসপাতালে থাকা অবস্থায় হাত না ধুয়ে ভুলক্রমে যদি আমি নাক কিংবা মুখ কিংবা চোখে হাত দেই তাহলেই আমার সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা তৈরী হলো। আমরা আমাদের সহযোগীদের নিরাপদ ভেবে কাছাকাছি গিয়ে যদি গল্প করি তাহলে মনে রাখতে হবে আমরা আমাদের কথার সাথে, প্রশ্বাসের সাথে ড্রপলেট ছড়াচ্ছি। হাচি কিংবা কাশি হলে ত কথাই নেই।

আমি মনে করি যে সকল চিকিতসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের অধিকাংশই কন্টাক্ট এবং ড্রপলেট ট্রান্সমিশনের এই চক্রকে গুরুত্ত্ব দিয়ে উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হয়েছেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে সাবধানী হতে সাহায্য করুন। সংক্রমন থেকে নিজেদের রক্ষা করুন। আমিন।

SHARE THIS ARTICLE