ব্রিটেনে অন্যান্য জাতির তুলনায় বাংলাদেশীদের করোনায় মৃত্যুহার সর্বাধিক

ডাঃ মোঃ সাজেদুর রহমান শাওন, এপিডেমিওলজিস্ট, ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া

পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড গত ২ জুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার নিয়ে তাদের গবেষণা রিপোর্ট পাবলিশ করেছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, ইংল্যান্ডে বসবাসরত বিভিন্ন জাতির মানুষের তুলনায় বাংলাদেশীদের মধ্যে করোনার মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। সাদা ব্রিটিশদের সঙ্গে তুলনা করার পর দেখা গিয়েছে বাংলাদেশীদের মধ্যে মৃত্যুর হার দ্বিগুণ। যেখানে সাদা ব্রিটিশদের সঙ্গে তুলনা করে ইন্ডিয়ানদের মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২২ গুণ আর পাকিস্তানিদের ১ দশমিক ৪৪ গুণ। সংখ্যাগুলোকে পুনরায় হিসাব করে যদি বলি তাহলে ইংল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যে করোনার মৃত্যুহার ইন্ডিয়ানদের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেশি আর পাকিস্তানিদের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। তার সঙ্গে আরও ভয়াবহ যে ব্যাপারটি সেটি হলো, বাংলাদেশীদের এই অধিক মৃত্যুহার যাদের বয়স ২০-৬৪ বছর এবং যাদের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি – সবার জন্যই প্রযোজ্য।

আমাদের দেশের মোট করোনাভাইরাসে মৃত্যুকে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মৃত্যুহার বের করে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে এর আগে বিভিন্ন সময়ে মানুষজন দাবি করার চেষ্টা করেছে যে, বাংলাদেশীদের করোনায় মৃত্যুহার বেশি। 

কিন্তু সেই হিসাবটিতে এপিডেমিওলজিক্যাল গবেষণার অনেকগুলো বিষয় অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে সেই ধরনের তুলনামূলক হিসাব ভুলে ভরা। যেমন, বাংলাদেশে যেহেতু টেস্ট কম হচ্ছে, তাই যাদের রোগের উপসর্গ অনেক বেশি, তাদেরকে বেশি টেস্ট করা হচ্ছে। আর এই গুরুতর আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেশি। আবার জনসংখ্যার গঠনে তারতম্য থাকায় আমরা সরাসরি দুটি দেশের মধ্যে মৃত্যুহার তুলনা করতে পারবো না। এই ধরনের আরও বেশ কিছু বিষয়ের জন্য বাংলাদেশীদের মধ্যে করোনার মৃত্যুহার তুলনামূলক কেমন তা সঠিকভাবে বলা একেবারেই সম্ভব ছিল না।

কিন্তু ইংল্যান্ডের এই গবেষণা রিপোর্টটি আজ আমাদেরকে জানিয়ে দিল যে অন্যান্য জাতির তুলনায় বাংলাদেশীদের মধ্যে করোনার মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। আসুন দেখি কী কী কারণে এই গবেষণা রিপোর্টটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য:

১। প্রথম যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো এই গবেষণায় ব্যবহৃত ডাটার কোয়ালিটি। এই গবেষণায় করোনা কেস এবং করোনায় মৃত্যুর ডাটা এসেছে ইংল্যান্ডের Office for National Statistics থেকে যারা হাই-কোয়ালিটি Surveillance System এর মাধ্যমে এই ডাটাগুলো সংগ্রহ করেছে। ফলে আনরেকর্ডেড কেস এবং ডেথ এর সংখ্যা খুব কম হওয়ার কথা। আর যদিও কিছু হয়ে থাকে সেটি শুধু বাংলাদেশীদের জন্য আলাদা করে হওয়ার কথা না, হলে সবার জন্য একইভাবে হওয়ার কথা।

২। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো এই গবেষণার আনালাইসিস। করোনায় মৃত্যুর হার হিসাব করার জন্য তারা সবচেয়ে ভালো স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেল ব্যবহার করেছেন এবং সেই মডেলে বয়স, লিঙ্গ, বসবাসের এলাকা, এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এই গবেষণার ফলাফল অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

৩। ইংল্যান্ডে যেহেতু সবাই NHS এর আওতায় ফ্রিতে চিকিৎসা পান, তাই সেখানকার বাংলাদেশীদের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার সম্ভবনাও একেবারে নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশে বসবাসরত মানুষজনের মধ্যে করোনায় মৃত্যুর হার ইংল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মৃত্যুহার থেকে কম হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আমি দেখছি না। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন বাংলাদেশীদের মধ্যে করোনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। সেটির ব্যাপারে এই রিপোর্টে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু আমরা যদি পূর্বের গবেষণালব্ধ উপাত্তগুলো থেকে ভেবে দেখার চেষ্টা করি তাহলে যে বিষয়গুলো উঠে আসবে সেগুলো হল:

১। বাংলাদেশীদের মধ্যে ডায়াবেটিস, হাইপ্রেসারসহ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি।

২। অন্যদের থেকে বিভিন্ন কারণে (যেমন ধূমপান, অপুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ব্যায়াম না করা) বাংলাদেশীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হতে পারে।

৩। বাংলাদেশীদের মধ্যে ফুসফুসের অসুখ (যেমন এজমা, COPD) বেশি হতে পারে, যার কারণে করোনা ভাইরাস ফুসফুসকে বেশি আক্রান্ত করতে পারছে।

৪। এই সবগুলো বিষয়ের পেছনে জেনেটিক কারণও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

কারণ যাই হোক না কেন, করোনায় মৃত্যু ঠেকাতে আমাদের উচিত হবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কমানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। আজ সারাদেশে প্রায় ৩ হাজার জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর তাই এই সময়ে আমাদের দেশে (কঠিন) লকডাউন দেয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। আশা করছি, সরকার সঠিক সিদ্ধান্তটি নিবেন।

SHARE THIS ARTICLE