
এ, কে, আজাদ – আইরিশ বাংলা পোষ্টঃ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে নয়াদিল্লিতে যাওয়ার সময় বহির্গমন গেট থেকে পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান (৩৮), মফিজুরের ব্যক্তিগত সহকারী সাব্বির খন্দকার (২৯) ও পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী শেখ তায়্যিবাকেও (২২) গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর পর তাদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিন থেকে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নুর পাপিয়া্কে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১ এর একটি দল।
তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, বাংলাদেশি দুই লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ জাল টাকা, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলংকান মুদ্রা, ১১ হাজার ৯১ মার্কিন ডলার ও সাতটি মোবাইল ফোন।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগ নেত্রী পাপিয়া পিউ নামেই তিনি বেশি পরিচিত। সমাজসেবা ও গাড়ি ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছে র্যাব- ১ এর অভিজ্ঞ দল। ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে এই অপরাধ জগতের সম্রাজ্ঞী পাপিয়া্র নানা অপরাধ কাণ্ডের তথ্য মিলেছে। তিন বছর আগে পাপিয়ার স্বামী সুমন এক সময় নরসিংদী ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। কয়েক বছর আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে স্বামীকে নিয়ে এলাকা ছাড়েন। ঢাকায় এসে গড়ে তোলেন নিরাপদ আস্তানা। মাসের পর মাস ব্যবহার করেছেন পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। চলাফেরা করেন সামনে পিছনে গাড়ির বহর নিয়ে। প্রভাবশালী অনেক রাজনীতিকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগে তাদের সঙ্গে ছবি তোলে প্রকাশ করেছেন নানা মাধ্যমে। এখন কি নেই তার? বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট। আছে দেশে বিদেশে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, অপরাধ জগতের ষোলকলাই পূর্ণ করেছেন। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, তদবিরবাজি, চাঁদাবাজি, জিম্মি করে টাকা আদায়, নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা, অশ্লীল ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং, অন্ধকার জগতের সব পথেই পা দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন অপরাধ জগতের রানী। র্যাব সূত্র জানিয়েছে, পাপিয়ার প্রধান ব্যবসাই ছিল এসকর্ট সার্ভিস। চাকরি দেবার প্রলোভন দেখিয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানের নারীদের ঢাকায় নিয়ে আসতো। তাদের কখনও তার বাসায় আবার কখনও পাঁচ তারকা হোটেলে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন।
র্যাব ১ জানায়, চাকরির নাম করে আনা কম বয়সী তরুণীদের চাকরি সে ঠিকই দিত তবে সেটি এসকর্ট সার্ভিসে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষিত সুন্দরী তরুণীদের সংগ্রহ করতেন। এক পর্যায়ে তাদেরকে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য করতেন পাপিয়া। এরই মধ্যে পাপিয়ার কাছ থেকে গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত অনেক ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করা হয়েছে। গোপন ক্যামেরায় মেয়েদের ছবি ধারণ করে তাদের নিয়মিতভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন তিনি। পাপিয়ার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়- পাপিয়া বসে আছেন বাইজিবাড়ির সর্দারনির মতো। তার হাতে মোটা একটি বেতের লাঠি। তার কব্জায় থাকা মেয়েরা কথা না শুনলে পেটাতেন। প্রতিদিন আড়াই লাখ টাকা মদের বিল দেন এই পাপিয়া। ৫৯ দিনে পাঁচ তারকা হোটেলের বিল পরিশোধ করেন ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮টাকা।

অভিযানের ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেট ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক বই, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড জব্দ করেছে র্যাব।
লে. কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ফার্মগেটে পাপিয়ার ২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নরসিংদী শহরে ২টি ফ্ল্যাট, ২ কোটি টাকা মূল্যের দুটি প্লট, চারটি বিলাসবহুল গাড়ি এবং গাড়ির ব্যবসায় প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে নামে-বেনামে অনেক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত আছে বলে জানা গেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট পেশা না থাকা সত্ত্বেও বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন পাপিয়া ও তার সঙ্গীরা।