কোভিড টিকার সর্বশেষ সংবাদ

ডাঃ জিন্নুরাইন জায়গীরদারঃ কোভিড মহামারিকে ধ্বংস করতে মানব সভ্যতার কাছে এখন একটাই অস্ত্র, অস্ত্র না বলে এটাকে ব্রহ্মাস্ত্র বলা যায়, আর সেটা হচ্ছে টিকা। এক বছরেরও কম সময়ে এই টিকা আবিষ্কার ছিল একবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ট আবিষ্কার। আর এই আবিষ্কারে যাদের অবদান অসামান্য তারা হচ্ছেন ডঃ উগুর শাহিন এবং ডঃ উজলুম টুরেসি, এই দুজনই অগ্রগামী ছিলেন এবারের নূতন পদ্ধতির টিকা আবিষ্কারে। যদিও তাদের আবিষ্কৃত টিকা ছাড়াও অন্য পদ্ধতির টিকাও বাজারে চলে এসেছে তবে তারা ছিলেন পথিকৃৎ।

অতীতেও মানবজাতিকে সুরক্ষিত রাখতে টিকা শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে। টিকার সফলতায় আমরা যে সকল রোগকে ভুলে যেতে বসেছি তাদের মধ্যে পোলিও, ধনুষ্টংকার (টিটেনাস) , পানি বসন্ত (চিকেন পক্স), গুটি বসন্ত (স্মল পক্স), হাম (মিজলস), ডিপথেরিয়া, হুপিং কফ, মাম্পস, হেপাটাইটিস, রুবেলা, ফ্লু, মেনিনজাইটিস; এসকল রোগের মধ্যে গুটি বসন্ত আজ আর পৃথিবীতে কোন মানুষকে আক্রমন করতে পারেনা অর্থাৎ গুটি বসন্ত রোগকে সমূলে উৎখাত করে দিয়েছে মানবসমাজ।

টিকা আবিষ্কারের এই অর্জনকে সফল করে তুলতে এই মুহূর্তে যে কাজটি মানবজাতির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন তা হচ্ছে দ্রুততম সময়ে বিশ্বব্যাপী এই টিকার সার্বজনীন এবং সফল  প্রয়োগ। চলুন আমরা দেখি এই ভ্যাপারে কতটুকু আমরা এগিয়েছি; যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থা “আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটা” তাদের ওয়েবসাইটে কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এই পরিসংখ্যান অনুসারে ইতিমধ্যে ২রা ডিসেম্বর’২০ থেকে শুরু করে ২রা ফেব্রুয়ারি’২১ এই দুই মাসে পৃথিবীর ৭৮টি দেশে সর্বমোট ১০কোটী ৭০ লক্ষ টিকার প্রয়োগ করা হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৪০ লক্ষ দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, ১ কোটী ৪০ লক্ষ ইউরোপিয়ান ইউন্যনে আর ১ কোটি ১০ লক্ষ দেয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক মহামারী ঘোষিত হওয়ার পর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ অনেক বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিতসা এবং টিকার ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত বিতরণ, সহজলভ্যতা এবং প্রাপ্তির অধিকারের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু টিকাকে সার্বজনীন করার ক্ষেত্রে সফলতা অর্জিত হয়নি। টিকা আজ মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হয়েছে এবং একই সাথে টীকা সকলের আগে পৌঁছে গেছে ধনাঢ্য আর ক্ষমতাবানদের হাতে। রাশিয়া এবং চীন তাদের আবিষ্কৃত টিকা তাদের দেশের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে বহির্বিশ্বে ব্যাবসায় নেমেছে কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব এটাকে পণ্য হিসেবে কিনে নিয়ে তাদের দেশের মানুষকে বিনে পয়সায় প্রদান করছে। অর্থ দিয়ে কিনে নেবার পরও প্রাপ্তি নিয়ে শুরু হয়েছে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। এগুলো কিন্তু মোটেও কাম্য ছিলনা।

কোভেক্সঃ মন্দের ভালো, কোভাক্স, নামক বৈশ্বিক ঐক্যজোট যার নেতৃত্ব দিচ্ছে গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন এন্ড ইমিউনাইজেশন (GAVI), কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন (CEPI) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। এই ঐক্যজোট বিশ্বব্যাপী কোভিড রোগ নির্নয়, চিকিৎসা এবং টিকা বিশ্বব্যাপী সরবারাহের একটি উদ্যোগ। 

কোভাক্স চুক্তির আওতায় বিশ্বের ৯২ টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (SII) দ্বারা তৈরি ফাইজার-বায়োএনটেক এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১৯ কোটি ডোজ টিকা পাবে। বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ২০% দেশ যারা প্রচুর টিকা কিনে তাদের দেশের জনগণের মধ্যে দিতে সক্ষম নয় তাদেরকে বিনা পয়সায় এই টিকা সরবরাহ করাই গ্যাভির মূল উদ্দেশ্য। গ্যাভি ২০২১ সালের মধ্যেই ১৩ কোটি টিকা ৯২টি দেশে পৌঁছে দেবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছে। 

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, ব্যানিন, বলিভিয়া, কম্বোডিয়া, ঘানা, দক্ষিণ সুদান, ইথিওপিয়া, নেপাল, সিরিয়া, ইয়েমেন সহ প্রায় ৩১ টি দেশ এই টিকা প্রাপ্তির তালিকায় রয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে রয়েছে, এঙ্গোলা, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, ভুটান, বলিভিয়া, ভারত, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ফিলিপিন্স ও পাকিস্তান সহ প্রায় ৫১টি দেশ। এছাড়া আরও দশটি দেশ রয়েছে যারা ইন্টার্নেশনাল ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশনের মাধ্যমে এই টিকা পাবে। 

সিডিসি (আফ্রিকা): কোভ্যাক্স ছাড়াও আফ্রিকার সিডিসি দুই অংশে ২৭ কোটি এবং ৪০ কোটী টিকা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। 

টিকা প্রদানে কোন দেশ এগিয়েঃ চলুন দেখা যাক কোন কোন দেশ এই টিকা প্রদানে অগ্রগামী রয়েছে। জনসংখ্যা অনুপাতে (প্রতি ১০০ জনে টিকা প্রাপ্তি) সবার আগে যে দেশটি রয়েছে তার নাম ইসরায়েল, এই দেশটি প্রতি ১০০ জনে ৫৮.৮৩ জনকে ইতিমধ্যে টিকা প্রদান সম্পন্ন করে ফেলেছে (৫৮.৮৩/১০০)। এর পরের অবস্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (৩৪.৭৯/১০০), যুক্তরাজ্য (১০০/১৪.৯৪), যুক্তরাষ্ট্র (৯.৮/১০০)। আয়ারল্যান্ড (৪.০৫/১০০) এবং ভারত (০.৩/১০০) কিন্তু বাংলাদেশের কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

টিকাগুলোকি এবং তারা কতটুকু কার্য্যক
এই মুহূর্তে বিশ্বে যে কয়েকটি টিকার প্রয়োগ চলছে, তাদের কার্য্যকারিতা দেখে নিনঃ
১। ফাইজার বায়োএন্টেকের টিকার কার্য্যকারিতা ৯৫% বলে প্রকাশিত হয়েছে।
২। মোডার্নার টিকার কার্য্যকারিতা ৯৪.৫% বলে প্রকাশিত হয়েছে। 
৩। গামালিয়া (স্পুটনিক ভি) টিকার কার্য্যকারিতা ৯১%। 
৪। নোভাভেক্স (যুক্তরাষ্ট্র) এর টিকা ৮৯.৩% (এখনো অনুমোদন পায়নি) 
৫। সাইনোফার্ম (চীন) এর টিকা ৭৯% 
৬। অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনেকা (যুক্তরাজ্য) ৭০%
৭। জনসন এন্ড জনসন এর টিকা ৬৬%
৮। ভারত বায়োটেকের কোভ্যাক্সিনের কার্য্যকারিতার কোন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি। 
৯। ক্যানসিনো আর সাইনোভ্যাকের (চীন) টিকারও কোন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি।

মন্তব্যঃ ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত  এই দুটি দেশ টিকা প্রদানে সবচেয়ে অগ্রগামী। আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই তারা তাদের পুরো দেশের জনগণকে টিকা প্রদান করে ইতিহাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। অন্যান্য দেশ এখনো বয়স্ক, অসুস্থ এবং ফ্রন্ট লাইন ওয়ার্কারদের দিয়ে শুরু করেছে তবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সাধারণ জনগণকে দিতে শুরু করেছে। অন্যান্য দেশ টিকা প্রদানে পিছিয়ে আছে অনেকটা। 
টিকাকে মুনাফার উদ্দেশ্যে ব্যাবহার না করে সারা বিশ্বে সার্বজনীন সরবরাহ করা অত্যাবশ্যক।

SHARE THIS ARTICLE