কোভিড মহামারিতে বিপর্যস্ত ভারতঃ বিশ্বে এক দিনে সংক্রমণের সর্বোচ্চ রেকর্ড

 

আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃকোভিড মহামারির বিশাল দ্বিতীয় তরংগ ভারতের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাকে বিপর্য্যস্ত করে দিয়ে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে। গতকাল বুধবার এক দিনে নূতন করে সংক্রমিত হয়েছেন প্রায় ৩ লক্ষ ১৬ হাজার মানুষ। এই সংখ্যা রাষ্ট্র হিসেবে এযাবতকালের এক দিনের সংক্রমণের সর্বোচ্চ সংখ্যা। সংক্রমণের সাথে তাল দিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর এই সংখ্যা ২১০২ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। 

টাইমস অব ইন্ডিয়া সূত্রে প্রকাশ, গতকাল বুধবার এক দিনে ভারতে নূতন করে সংক্রমিত হয়েছেন ৩, ১৫, ৯২৫ জন। মহামারি শুরুর পর থেকে ভারতে গতকালই প্রথম এক দিনে সংক্রমণ ৩ লক্ষ ছাড়িয়ে গেল এবং এই মাত্রায় সংক্রমন হওয়ায় এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৮ই জানুয়ারিতে সংক্রমিত ৩,০৭, ৯৫৮ জনের রেকর্ড মাত্রা অতিক্রম করে পৃথিবীতে এক রাষ্ট্রে একদিনে সংক্রমণের সর্বোচ্চ রেকর্ড করলো। 

গত ১লা এপ্রিল ১ লাখের মাত্রা অতিক্রমের পর দ্রুততম বেগে মাত্র ১৭ দিনে এই সংখ্যা ৩ লক্ষ অতিক্রম করেছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুসারে ভারতে প্রতিদিন সংক্রমণের মাত্রা বেড়েছে ৬.৭৬%, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৪ গুনের বেশী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ লক্ষে এই সংক্রমণ ৯৭,৮৮১ জন, যা ভারতে  ১১,৪১৮। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংক্রমণের হার ভারতের চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশী। প্রতি ১০ লক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭১২ জন, যেখানে ভারতে এই মৃত্যু ১৩২ জন। জনগোষ্ঠীর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ গুণ বেশী মৃত্যু হয়েছে। 

এই রেকর্ড সংক্রমণের ফলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান শয্যা চাহিদার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে চরম অক্সিজেনের সংকট। ভারতের রাজধানী দিল্লীতে হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগীরা অসহায় হয়ে পড়েছে এবং কিছু কিছু হাসপাতালে অক্সিজেন তীব্র সংকট দেখা দেয়ায় রোগীরা মৃত্যুবরণ করছে বলে সংবাদে প্রকাশ। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে যে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা পর আর কোন অক্সিজেন থাকবেনা আর প্রাইভেট হাসপাতালে ৪-৬ ঘণ্টার মধ্যে অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবে যদি দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যাবস্থা না হয়। দিল্লীর বেশির ভাগ হাসপাতালে আর কোন সাধারণ শয্যা কিংবা আই সি ইউ শয্যা খালি না থাকায় মারাত্নক সংকটে রোগীদের জীবন বিপন্ন। 

Two to a bed in Delhi hospital as India's COVID crisis spirals - The  Economic Times
একই শয্যায় দুই রোগী

সরকার ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানিয়েছে, বড় সরকারী হাসপাতালে আর কেবল ৮ থেকে ২৪ ঘন্টা অব্যাহত থাকার মত পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছিল, কিছু বেসরকারী হাসপাতালে মাত্র চার বা পাঁচ ঘন্টা যথেষ্ট ছিল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, যিনি মঙ্গলবার স্ত্রীর কোভিড পজিটিভ হওয়ার পর আইসোলেশনে থেকে এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন যে রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল আর মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য পর্য্যাপ্ত অক্সিজেন বাকি আছে।” পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্র এবং রাজধানী মুম্বাইয়ের হাসপাতালগুলিতেও এই সংকট তীব্র হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে।

Despite COVID-19 crisis at home, India doubled oxygen exports in FY21
অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট

এদিকে অসুস্থদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে করোনাভাইরাসের আর টি পি সি আর পরীক্ষা বিলম্বিত হচ্ছে, যার কারণে সংকট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। টেস্ট করাতে ৩-৫ দিন লেগে যাওয়ার কারণে অসুস্থরা আর নিজেদের আইসোলেট করতে পারছেন না বিধায়, সংক্রমণের সম্ভাবনা তীব্রতর হচ্ছে। কিছু কিছু পরীক্ষাগার অতিরিক্ত নমুনা সংগ্রহের ফলে আর নমুনা নিতে না পেরে বন্ধ করে দিয়েছে। টেস্ট করাতে ব্যার্থ হওয়ার ফলে কিছু কিছু চিকিৎসকরা রোগ নির্নয়ের জন্য শুধুমাত্র সি টি স্ক্যান কিংবা উপসর্গের উপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা প্রদান করছেন। 

জানুয়ারিতে টিকা কার্য্যক্রম শুরু করার পর দেশটির মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশকে ইতিমধ্যে টিকা প্রদান করা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে টিকা সংকটের ঘোষণা দিলে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পর্য্যাপ্ত টিকা প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। সেরাম ইন্সটিটিউট ইতিমধ্যে তাদের টিকা তৈরি কয়েকগুণ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। সরকার বিদেশে রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। 

হত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন যে, “ভারত একটি করোনভাইরাস ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছে এবং স্বাথ্য ব্যাবস্থা বিপর্য্যস্ত হবার দ্বারপ্রান্তে এসে গিয়েছে। অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে অনেকগুণ। যাদের প্রয়োজন তাদের সকলকে অক্সিজেন নিশ্চিত করতে আমরা দ্রুত  সংবেদনশীলতার সাথে কাজ করছি। কেন্দ্র, রাজ্য এবং বেসরকারী সংস্থাগুলি সবাই মিলে কাজ করছে।” 

PM Modi speech Highlights: 'Lockdown last resort; focus on  micro-containment'
নরেন্দ্র মোদী

নরেন্দ্র মোদী গত কয়েক মাস যখন সংক্রমণ কমে আসছিলো তখন নিয়ন্ত্রণ ব্যাবস্থা শিথিল করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমাবেশ করার সুযোগ করে দেয়ার কারণে এই দ্বিতীয় তরংগ এসে দেশকে সংগকটের ফেলে দিয়েছে বলে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। 

নরেন্দ্র মোদী অবশ্য বলেছেন, “সংক্রমণের দ্বিতীয় তরঙ্গ ঝড়ের মতো এসেছে।” মোদী নাগরিকদের বাড়ির ভিতরে থাকতে এবং ভারতের স্মরণকালের স্বাস্থ্যব্যাবস্থার সংকটপূর্ন অবস্থার মধ্যে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান। সংক্রমণ প্রতিরোধে নয়াদিল্লিতে ছয় দিনের লকডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদে বলেছে, মুম্বাইয়ের এই সপ্তাহে একটি কঠোর লক ডাউনের পরিকল্পনা রয়েছে।

গত বছর করোনাভাইরাস প্রথম সংক্রমণের সময় মোদী ভারতবর্ষের ১৩০ কোটি জনগোষ্ঠীর জন্যলক ডাউন ঘোষণা করেছিলেন। তবে নরেন্দ্র মোদী সরকার অর্থনৈতিক কারণে প্রথম থেকেই কঠোর লক ডাউনের পক্ষপাতী ছিলেন না। মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, “লকডাউন কেবলমাত্র “শেষ অবলম্বন” হওয়া উচিত।” তবে অবলম্বনের শেষ মাত্রা কোথায় হবে তা তিনি সংজ্ঞায়িত করেন নি কিংবা তার উচিতের সংজ্ঞাও তিনি জানান নি।

তথ্যসূত্রঃ অল ইন্ডিয়া টাইমস, ওয়ার্ল্ডোমিটার, আল জাজিরা 

SHARE THIS ARTICLE