
ডাঃ ইসমত কবীরঃ গত ৩০শে ডিসেম্বর ২০২০, যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ডের আবিষ্কৃত টিকার অনুমোদন বিশ্বের জন্য যুগান্তকারী একটি ঘটনা। গবেষণা চলাকালীন অক্সফোর্ডে র্নীরিক্ষাধীন টিকার নাম ছিল “চ্যাডোক্স-এন কোভ-১৯” ( শিম্পাঞ্জী এডেনোভাইরাস অক্সফোর্ড)। পরবর্তীতে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এস্ট্রাজেনেকা এই টিকার বাণিজ্যিক নাম দিয়েছে “এ জেড ডি ১২২২”। ফাইজার-বায়োনটেকের ভ্যাক্সিনের পর এটি ছিল যুক্তরাজ্য সরকারের দ্বিতীয় টিকার অনুমোদন।
সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট এই টিকা “কোভিশিল্ড” নামে বাজারজাত করছে।শিম্পাঞ্জির এডেনোভাইরাসকে বাহক বানিয়ে এ টিকাটি তৈরি করা হয়েছে। জিন প্রযুক্তির সাহায্যে কোভিড-১৯ এর স্পাইক বা কাঁটার প্রোটিন তৈরির নির্দিষ্ট জিনটা এতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে এ ভাইরাসটি শরীরে গিয়ে স্পাইক প্রোটিন তৈরি করতে পারে এবং শরীরে স্পাইক প্রোটিন এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা তৈরী হয়। বাহক ভাইরাসটি ‘নন-রেপ্লিকেটিং’ অর্থাৎ শরীরে গিয়ে বংশ বিস্তার করবে না।
এটার দুটো ডোজ ইঞ্জেকশন হিসেবে মাংসপেশিতে দিতে হবে, প্রথম ডোজ দেওয়ার একুশ দিন পর থেকেই শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা তৈরী হতে থাকে। কিন্তু এ ক্ষমতা কতদিন স্থায়ী হবে তা জানার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয় ডোজটি চার থেকে বার সপ্তাহের মধ্যে দিতে হবে।০.৫ মিলিলিটার এর প্রতি ডোজে ৫০০০ কোটি (ফিফটি বিলিয়ন) ভাইরাস কণিকা থাকবে।
ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ কোন উপাদান এতে নেই। গুরুতর এলার্জির শিকার হয়েছেন এমন ব্যক্তি ছাড়া এ টিকা আঠারো বা তার উপরের যে কেউ নিতে পারবেন। আগে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন এমন সবাইকে টিকাটি দেওয়া যাবে। কোভিড-১৯ এ সংক্রমণ ও জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন এমন গর্ভবতী বা স্তন্যদাত্রী মায়েরাও এ টিকা নিতে পারবেন।
অক্সফোর্ডের এই টিকার সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণ অন্য সব টিকার মতোই, প্রয়োজন দুই থেকে আট ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা। ফ্লু এর টীকা নেওয়ার অন্তত দু’সপ্তাহ পর এ টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।এ টিকা রোগ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেবে গড়পড়তা শতকরা সত্তর ভাগ। কোভিড-১৯ জনিত জটিলতা বা মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রতিরোধে এ টিকা শতভাগ কার্যকর। বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী তৃতীয় পর্বের ট্রায়ালে অংশ নিয়েছেন, গুরুতর জটিলতায় কেউই আক্রান্ত হননি। এই টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলো মামুলি ও ক্ষণস্থায়ী।
প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠান এস্ট্রাজেনেকা এই টিকা থেকে কোন মুনাফা করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে, এতে করে এর দাম পড়ছে ডোজ প্রতি তিন থেকে চার ডলার (প্রায় তিনশো টাকা)। দামের দিক থেকে অন্যান্য টিকার থেকে এটা অনেক সাশ্রয়ী।অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তৈরি করা যাবে এ টীকা। ইতোমধ্যে এর বিশ কোটি ডোজ প্রস্তুত আছে, প্রতি মাসে দশ থেকে বিশ কোটি ডোজ প্রস্তুত করার সক্ষমতা রয়েছে এস্ট্রাজেনেকা নামক প্রতিষ্ঠানটির।’কোভ্যাক্স’ এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ টিকা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দুহাজার একুশ সালে বিশ্বকে করোনামুক্ত করার ক্ষেত্রে এ টিকা বড় ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে ১৫ লক্ষেরও অধিক মানুষ টিকাপ্রাপ্ত হয়েছেন।