
আইরিশ বাংলাপোষ্ট অনলাইন ডেস্কঃ তরুণ ‘ইসলামি বক্তা’ আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের করোনা উপসর্গ দেখা দিয়েছে । নিখোঁজের আটদিন পর বাড়িতে ফিরে তিনি জ্বর, গলা ব্যাথা, সর্দিতে আক্রান্ত। তাই কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ত্ব-হার মামা সিরাজুল ইসলাম সনেট। শনিবার বিকেলে ত্ব-হার সঙ্গে গণমাধ্যম কর্মীরা কথা বলতে চাইলে তিনি এ তথ্য দেন। এ ছাড়া ত্ব-হার মা-বোন কেউ গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে, পারিবাবিক সূত্রে জানা গেছে, ত্ব-হার দুই স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছিলো না। ত্ব-হার দুই স্ত্রীর বিরোধের বেশ কিছুদিন ধরে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভুগছিলো। এ কারণেই সবার থেকে একটু আলাদা থাকার জন্য বন্ধু সিয়ামের বাসায় আশ্রয় নেন ত্ব-হা।
তরুণ ইসলামী বক্তা আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানাসহ তার সঙ্গীদের পরিবারের জিম্মায় দিয়েছে আদালত। তার আইনজীবী জানিয়েছেন, দুই স্ত্রীর মধ্যে চরম বিরোধ থাকায় তার (ত্ব-হা) মায়ের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। জবানবন্দি পর্যালোচনা শেষে শুক্রবার মধ্যরাতে তাদেরকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে আদালত।
সূত্র জানায়, ত্ব-হা জবানবন্দিতে আদালতে বলেছেন, তার ফিরে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখার পেছনে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ ছিল। তার বেশ কিছু ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা ছিল। এ কারণেই সবার থেকে একটু আলাদা থাকার জন্য সিয়ামের বাসায় আশ্রয় নেন।
সেখানে গিয়ে ত্ব-হা অসুস্থতা বোধ করেন। ছিল করোনার উপসর্গও। ফলে তিনি একবারের জন্য ফোন খোলেননি।
আদালতকে জানিয়েছিলেন, যারা তার সঙ্গে ছিলেন, তারা তার খুব নিকটজন এবং বিশ্বস্ত। যে চালক গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তিনিও তার ঘনিষ্ঠ। এ কারণে তারাও তার কথা শুনেছেন।
শুক্রবার সুস্থ বোধ করলে দুপুর ১২টার দিকে রংপুরে প্রথম শ্বশুরের বাসায় এসে অবস্থান করেন এবং অন্যরা সবাই তাদের নিজ নিজ বাসায় চলে যান।
ত্ব-হা আদালতকে জানিয়েছেন, তিনি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর তাকে নিয়ে যে এত সব হয়েছে, তা তিনি ধারণাও করতে পারেননি।
ফোন বন্ধ থাকায় অনলাইনে কী লেখালেখি হচ্ছে, তা তিনি ধারণা করতে পারেননি। টেলিভিশন থেকেও দূরে থাকায় বাইরের যে পরিবেশ ছিল তিনি বা তার সঙ্গীরা আঁচ করতে পারেননি।
এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন জবানবন্দিতে।
ত্ব-হার প্রথম স্ত্রীর নাম আবিদা নুর, দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন্নাহার। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তিন বছরের একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলেসন্তান আছে। দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন নাহার সারা মিরপুর আল ইদফান ইসলামী গার্লস মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক। তিন মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল।
গত ১০ জুন দিবাগত রাত থেকে কোনো খোঁজ মিলছিল না আবু ত্বহা, তার দুই সঙ্গী আব্দুল মুহিত, মোহাম্মদ ফিরোজ ও গাড়িচালক আমির উদ্দিনের। সেদিন বিকাল ৪টার দিকে ওই তিনজনসহ আবু ত্ব-হা রংপুর থেকে ভাড়া করা একটি গাড়িতে ঢাকার পথে রওনা দেন। রাতে মোবাইল ফোনে সর্বশেষ কথা হলে তিনি সাভারে যাচ্ছেন বলে তার মাকে জানান।
এরপর রাত ২টা ৩৬ মিনিটে প্রথম স্ত্রী হাবিবা নূরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় আদনানের। তিনি সাভার যাচ্ছেন বলেই জানান স্ত্রীকে। তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ থাকায় আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
রংপুরের আলোচিত বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান শুক্রবার দুপুরে তার শ্বশুরের বাসায় আসেন। পরে সেখান থেকে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। পরে বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর পুলিশ।
শুক্রবার রাত ৯টায় নগরীর সেন্ট্রাল রোডের মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয় থেকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম হাফিজুর রহমানের আদালতে নেওয়া হয় পুলিশ হেফাজতে থাকা ইসলামিক বক্তা আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান, তার গাড়ি চালক আমির উদ্দিন ও সফর সঙ্গী আব্দুল মুহিতকে। এরপর দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা তাদের জবানবন্দি নেন বিচারক। তাদের কেউ অবরুদ্ধ করে রাখেনি প্রমাণিত হওয়ায় পরিবারের জিম্মায় তাদেরকে তুলে দেয় আদালত। রাত পৌনে ১২টায় পরিবারের সঙ্গে বাড়ি ফেরেন ত্ব-হাসহ তার দুই সফরসঙ্গী। অপর সফর সঙ্গী বগুড়ার ফিরোজকে স্থানীয়ভাবে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আবু ত্ব-হা’র আইনজীবি অ্যাড. সোলায়মান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান, মুহিন আনসারী ও আমির উদ্দিন ফয়েজকে শুক্রবার পুলিশ উদ্ধার করেছে। তারা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তবে আসামি হিসেবে নয়। এতে বিচারক নিশ্চিত হয়েছেন যে তাদেরকে কেউ অবরুদ্ধ করে রাখেনি। তাই পরিবারের জিম্মায় তাদেরকে দেওয়া হয়েছে।
আদালত পাড়ায় আবু ত্ব-হার সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরা কথা বলার চেষ্টা করলে কোন মন্তব্য করেননি তিনি। তবে আবু ত্ব-হা’র মামা আমিনুল ইসলাম দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, দেশবাসীর সমর্থন ও সরকারের আন্তরিকায় আবু ত্ব-হাকে আমরা ফিরে পেয়েছি। এজন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
তরুণ ‘ইসলামি বক্তা’ আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান গাইবান্ধার একটি বাড়িতে সঙ্গীসহ আত্মগোপনে ছিলেন। সেখানে সাতদিন অবস্থানের পর শুক্রবার সকালে স্বেচ্ছায় তারা রংপুরে চলে যান। যে বাড়িতে তিনি ছিলেন সেই বড়ির মালিক ত্ব-হা’র বন্ধু সিয়ামের মা নিশাদ নাহার এ কথা জানিয়েছেন। নিশাদ নাহার বলেন, ‘ত্ব-হা এখানে এসে বলে, আমাকে দু’জন লোক ফলো করছে, আমরা এখানে কিছুদিন থাকব।’
তিনি বলেন, রংপুরে এসএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়ার কারণে আমার ছেলের সঙ্গে তার পরিচয়। এসএসসি পাশের পর তারা দু’জন দুই কলেজে পড়লেও একসঙ্গে চলাফেরা করত। তারপর ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন দু’জন একসঙ্গেই চলত। এদিকে আমরা গাইবান্ধায় চলে আসি। এখানে আসার পর আমার ছেলের চাকরি হয়। চাকরি সূত্রে সে এখন রংপুরে থাকে। আর ত্ব-হা আমার বাসায় এর আগে অনেকবার এসেছে।’
চারদিকে তাদের নিয়ে তোলপাড়, তারপরও আপনারা কেন জানেননি, এমন প্রশ্নের জবাবে নিশাদ নাহার বলেন, আসলে এটা আমি ঠিকভাবে জানতে পারিনি কারণ আমার বাসার টিভিটা নষ্ট। আর আত্মীয়স্বজনরা আমাকে ফোনে বলেছে ওতো নিখোঁজ। তারাও বলেছে না জানাতে। আমার ছেলেরও নিষেধ ছিল। কিন্তু পরে আমি ত্ব-হাকে বলেছি, যেহেতু মিডিয়ায় তোমাদের নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে, তোমরা কিন্তু এবার যেতে পার। তারপর তারা চলে গেছে।
আবু ত্ব-হা’র সঙ্গে আরও যারা আত্মগোপনে ছিলেন তারা হলেন আব্দুল মুকিত, মোহাম্মদ ফিরোজ ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন ফয়েজ। জানা গেছে, আদনানের বিভিন্ন ইসলামিক অনুষ্ঠান ও মাহফিলে তারা একসঙ্গেই থাকতেন। এই তিনজনের সঙ্গে ত্ব-হা’র সখ্যতা ছিল।নিশাদ নাহার জানান, ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা সাতদিন এই বাড়িতে থাকলেও আশপাশের কেউ জানত না।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ৮ দিন নিখোঁজ থাকার পর শুক্রবার দুপুরে রংপুর নগরীর মাস্টারপাড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে ইসলামী বক্তা ত্ব-হাকে এবং হাজীরহাটের নিজ বাড়ি থেকে গাড়ি চালক আমির উদ্দিন ও জায়গীরহাট থেকে সফর সঙ্গী আব্দুল মুহিতকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। ত্ব-হা স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে গাইবান্ধায় বন্ধুর বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলন করে জানায় পুলিশ।