
আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ ফরিদপুরে বিএনপির সাংগঠনিক বিভাগীয় সমাবেশের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কোমরপুর আবদুল আজিজ ইনস্টিটিউট মাঠ। ইতিমধ্যেই বিশাল আকারে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। সমাবেশস্থলসহ ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ মোড় থেকে ভাঙা রাস্তার মোড়সহ প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়কে শোভা পাচ্ছে বিএনপি নেতাদের ব্যানার, ফেস্টুন আর প্ল্যাকার্ড। কেন্দ্রীয় নেতাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বেশ কয়েকটি স্থানে বানানো হয়েছে তোরণ। মাঠ ও মাঠের বাইরে লাগানো হয়েছে শতাধিক মাইক। আলোকসজ্জা করা হয়েছে মাঠজুড়ে।
এদিকে বিএনপির এ সমাবেশ ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের আগে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিকল্প প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। তারা সমাবেশের তিন দিন আগে থেকেই ফরিদপুরে আসতে থাকেন। বুধবার (৯ নভেম্বর) রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানের নেতাকর্মীরা বাস-ট্রাকে করে আসতে থাকেন। বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় দুদিনের পরিবহন ধর্মঘট চলায় শুক্রবার সকাল থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলে এবং অনেককেই পায়ে হেঁটে সমাবেশে আসতে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে জানান, পথে পথে তাদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পুলিশ যানবাহন আটকে দিয়েছে। অনেকে একসঙ্গে থাকলে তাদের ফরিদপুরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাধা দিয়েছে। শুক্রবার (১১ নভেম্বর) দুপুরের পর থেকে রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানের নেতাকর্মীরা ট্রেনে চড়ে সমাবেশস্থলে আসেন। শুক্রবার সন্ধ্যার সময় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সমাবেশস্থল লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে।
তিন দিন আগে যারা সমাবেশস্থলে এসেছেন তারা আবদুল আজিজ ইনস্টিটিউট স্কুল মাঠে রাতযাপন করেন। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজন ও বিএনপি নেতাদের বাসায় থাকছেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ফরিদপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সমাবেশে আসার পথে বিএনপির নেতাকর্মীদের পথে পথে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সমাবেশে যাতে লোকজন আসতে না পারে সেজন্য সব ধরনের কৌশলই প্রয়োগ করছে স্থানীয় প্রশাসন। তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের কৌশল খাটিয়ে বিএনপির সমাবেশ বানচাল করা যাবে না।’
শুক্রবার দুপুরে সমাবেশস্থল কোমরপুর আবদুল আজিজ ইনস্টিটিউট মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, সমাবেশের মঞ্চসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। মাঠের পূর্ব পাশে বিশাল আকারের মঞ্চ বানানো হয়েছে। নারীদের বসার জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। গত তিন দিন ধরে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নেতাকর্মীদের রাতযাপনের জন্য মাঠের বাইরে তৈরি করা হয় বিশাল আকারের প্যান্ডেল। লোকজনদের খাবারের জন্য স্কুলের পেছনে রান্নার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া থাকা ও রান্নার আয়োজন করা হয়েছে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার বাড়িতে। সমাবেশে নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে দেখভালের কাজ করছিল স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে একটি তদারকি কমিটি।
আজকের সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধান বক্তা হিসেবে থাকবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একেএম কিবরিয়া স্বপন বলেন, ‘মহাসমাবেশের জন্য আমরা ফরিদপুর শহরে অবস্থিত রাজেন্দ্র কলেজ মাঠসহ চারটি স্থান চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে কোমরপুর স্কুল মাঠে সমাবেশের অনুমতি দেয়। আমরা তাও মেনে নিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন এবং সরকারি দলের নেতারা সমাবেশ বানচাল করতে এখনও সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। সরকারের ইন্ধনে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে। একসঙ্গে বেশিসংখ্যক লোক দেখলেই তারা ফরিদপুরে ঢুকতে দিচ্ছে না। তার পরও সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ এসে উপস্থিত হচ্ছে।
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘সরকারের সময় শেষ হয়ে এসেছে। এ জালিম সরকারকে আর মানুষ ক্ষমতায় দেখতে চায় না। আগামী ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ সরকারকে লালকার্ড দেখাবে জনগণ।’
মহাসমাবেশের সমন্বয়ক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। তারা দমন পীড়ন করে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চায়। কিন্তু বাংলার মানুষ জেগে উঠেছে। তারা আর কোনো সুযোগ দেবে না এ সরকারকে। অবিলম্বে এ সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে।
যান চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তি
এদিকে বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে ফরিদপুরসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫টি জেলায় পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। ফলে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে সাধারণ মানুষ। ফরিদপুরের ওপর দিয়ে মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোরসহ পার্শ্ববর্তী জেলার কোনো বাস চলাচল করেনি। এ কারণে সকাল থেকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ছিল চরমে। হঠাৎ করে পরিবহন ধর্মঘট ডাকায় ফরিদপুরের পৌর বাস টার্মিনাল থেকে কোনো ধরনের বাস চলাচল না করায় কর্মস্থলে যেতে ভোগান্তির শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। অনেককেই পায়ে হেঁটে এবং ভ্যানে করে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
ফরিদপুরের ভাঙা থেকে নওগাঁ যাওয়ার জন্য বের হন আমিনুল হক। তিনি জানান, বাসা থেকে বের হয়ে কোনো যানবাহন পাননি। পরে ৩০০ টাকা খরচ করে ইজিবাইকে চড়ে ফরিদপুরে আসেন। কিন্তু ফরিদপুর থেকে কোনো বাস না ছাড়ার কারণে তিনি নওগাঁ যেতে পারেননি। ফলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
পথে পথে পুলিশের তল্লাশি
মহাসমাবেশকে সামনে রেখে শুক্রবার শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের তরফ থেকে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়। এ সময় সড়ক দিয়ে চলাচলরত যানবাহন থামিয়ে তা তল্লাশি করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে তারা এ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এ ছাড়া ফরিদপুর শহরে যাতে কেউ অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে না পারে সেজন্য তদারকি করা হয়।
আওয়ামী লীগের গণমিছিলএদিকে বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকালে গণমিছিল করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। আলীপুরে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের সামনে থেকে বিশাল একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি নিলটুলী, ঝিলটুলী, মুজিব সড়ক, থানা রোড হয়ে জনতা ব্যাংকের মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হক, সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ইশতিয়াক আরিফসহ স্থানীয় নেতারা। বক্তারা বিএনপির সমাবেশের নামে কোনো রকম নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করলে তা কঠোর হাতে দমন করার ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগের গণমিছিলে অংশ নিতে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে নেতাকর্মীরা ট্রাক, ইজিবাইক, নছিমন, মাহেন্দ্রসহকারে আসেন।