ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: আলোচনার কেন্দ্রে ‘অভিবাসন’

আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ ১৯৭৩ সালে ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বেকারত্ব রোধ করার আশায় বহু পেশায় অভিবাসন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল৷ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভ্যালেরি জিসকার্ড দেস্তাং এবং তার অভিবাসন বিষয়ক সচিব বিভিন্ন পেশায় অভিবাসীদের পরিবর্তে ফরাসি নাগরিকদের চাকরিতে প্রতিস্থাপন করেন৷ অর্থ্যাৎ, সে সময় বার্তা দেয়া হয়েছিল: ‘আমাদের আর অভিবাসীদের প্রয়োজন নেই’৷

তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিবাসন বিরোধিতার ধারণাটি বেশ বিতর্কিত এমনকি অর্থনীতিবিদরাও এই মডেলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকেন৷

১৯৮০-এর দশকে, কট্টরপন্থী ন্যাশনাল ফ্রন্টের (বর্তমান ন্যাশনাল র‍্যালি) উত্থান ঘটে৷ সেই সময় ভোটারদের মধ্যে বড় একটি অংশের চিন্তা ছিল, ফ্রান্সে জন্ম নেয়া আলজেরীয় অভিবাসীদের সন্তানরা জন্মগতভাবে ফরাসি৷ কিন্তু মরক্কো বা টিউনিসিয়ান অভিবাসীদের সন্তানদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফরাসি নাগরিকত্ব অর্জন করতে হবে৷

ভোটারদের মধ্যে এই ধারণার পেছনে যুক্তি ছিল, আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশকালেই আলজেরীয়রা ফরাসি হয়ে উঠেছিল৷ এই প্রশ্নটি বেশ কয়েক বছর ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল৷ এমনকি পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে এটি নিয়ে একটি আইন হয়েছিল৷

আইনে বলা হয়েছিল ফ্রান্সে জন্ম নেয়া অভিবাসী সন্তানরা বিশেষ সুবিধায় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে৷ তবে, পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে সোশ্যালিস্ট লিওনেল জসপা সরকার ক্ষমতায় ফিরে এলে এই আইনটি বাতিল করা হয়৷

তাই অভিবাসনের বিষয়টি নতুন নয়৷ যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা হল বিতর্কের উগ্রতা৷ পূর্ববর্তী নীতিগুলির ব্যর্থ বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে আমরা, ‘অনেক অভিবাসী ফ্রান্সে আসছে’ এমন নানান মন্তব্য করতে পছন্দ করছি৷

যেহেতু ফ্রান্সে অবস্থন করা বেশিরভাগ অভিবাসীর তাদের পরিবারকে নিয়ে আসা, অধ্যয়ন করা বা চাকরি করার আইনি অধিকার আছে, সেক্ষত্রে এসব অধিকার লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন৷

নির্বাচনে এসব প্রচারণা প্রার্থীদের সমর্থকদের মানসিকতার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রূপ নেয়৷ তবে এটি সত্য এ জাতীয় প্রচারণা অনেক ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে আগ্রহী করে তোলে৷

২০২২ সালের নির্বাচনে ডানপন্থী রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ভালেরি পেক্রেস রোববার তার প্রথম বড় সমাবেশে, অভিবাসীদের ‘মহা প্রতিস্থাপন’ (অভিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া) করার কথা বলেছেন৷ এই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন ডানপন্থী প্রার্থী এই অভিব্যক্তিটি ব্যবহার করেছেন, যা সাধারণত কট্টর ও উগ্র ডানপন্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কী বলবেন?

ফ্রঁসোয়া হেরান: ভালেরি পেক্রে স্পষ্টত ষড়যন্ত্র তত্ত্বে পড়ে ‘মহা প্রতিস্থাপন’ এর মতো শব্দ ব্যবহার করে রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম করেছেন৷ এরিক জেমুর এবং মারিন লো পেনের প্রচার তাকে ধাক্কা দিয়েছে৷ ডানপন্থী শিবিরের ভোট পেতে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন৷

তার এই তত্ত্বটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত৷ এটা সত্য যে ইল-দ্য-ফ্রঁন্স বা বৃহত্তর প্যারিসের কিছু এলাকায় অভিবাসী শিশুদের সংখ্যা বেশি৷ তবে অন্যান্য এলাকায় অভিবাসী শিশুদের সংখ্যা খুব কম৷ মূলত পুরো ফরাসি ভূখণ্ডে অভিবাসীদের সংখ্যা অসম৷ ‘মহা প্রতিস্থাপন’ শব্দ ব্যবহার করে তিনি শুধু সবচেয়ে বেশি অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর উদাহরণ টেনে এনেছিলেন৷

এই বক্তব্যের প্রবক্তারা ফরাসি বংশোদ্ভূত এবং অভিবাসী নারীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের পার্থক্য তুলে ধরেন৷

তার উপর ফ্রান্সে জন্ম নেয়া প্রতি ছয়জনের মধ্যে মাত্র একটি শিশু অভিবাসী, যা মোট জনসংখ্যার উপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না৷

মনে রাখা উচিত, এই ধারণাটি ১৮৮০ সালে বিদ্যমান ছিল৷ সেসময় অনেকেই অনুমান করত ফ্রান্সের উত্তর অঞ্চলে ফরাসিদের তুলনায় বেলজিয়ান অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি৷

এমনকি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সময়েও, ‘মহা প্রতিস্থাপন’-এর মতো ধারণা বিদ্যমান ছিল৷ তখন ইহুদিদের আলজাস অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে নিষেধ করা হয়েছিল৷ কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, ইহুদিরা এই অঞ্চলে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে৷ অনুমান করা হয়েছিল, ইহুদি নারীদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা অনেক বেশি এবং আলজাস অঞ্চলে তারা বিপুল জমি কিনেছিল৷

অতীতে, আমরা পিৎজা দোকান দেখে হতবাক হয়েছিলাম, আর আজকে ব্যাপকহারে হালাল মাংসের দোকান দেখে হচ্ছি৷

ফ্রান্সে বিদেশিরা ‘আক্রমণ’ করেছে, অনেক রাজনীতিবিদ এরকম বলছেন৷ অভিবাসন কি আগের চেয়ে আজকের দিনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু?

ফ্রঁসোয়া হেরান: বিশ্বায়নের কারণে আজকের পৃথিবীতে অভিবাসন আরও গুরুত্বপূর্ণ৷ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এই ধারণা বাড়ে কমে৷ রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন, অভিবাসন অব্যাহত রয়েছে৷ স্পষ্টই, রাজনীতিবিদরা এটি রুখতে তেমন কিছুই করতে পারবেন না৷

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসনের যে খাতটি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তা হল বিদেশি ছাত্রদের পড়তে আসা৷ কিন্তু ফ্রান্সে অভিবাসী জনসংখ্যার এই বৃদ্ধি স্পেন, ইটালি, জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় অনেক কম৷

ধনী দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট ওইসিডি এর তথ্য অনুসারে, ফ্রান্সে বিদেশিদের মোট সংখ্যা ও বার্ষিক অভিবাসী প্রবেশের হার জোটভুক্ত অন্যান্য দেশের গড়ের নিচে৷ ফ্রান্স অভিবাসনের জন্য কোনো মহান দেশ নয়৷

এই তথ্যগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক আলোচনার বিরুদ্ধে যায়৷ অভিবাসন নিয়ে এত মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কেন?

ফ্রঁসোয়া হেরান: আমরা একটি সত্যকে স্বীকার করতে যতটা সময় ব্যয় করি তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি একটি অসত্য তথ্যকে খণ্ডন করতে৷ অ্যামেরিকান সাংবাদিক হেনরি লুই মেনকেন বলেছিলেন, ‘‘প্রতিটি সমস্যার জন্য তিন ধরনের সমাধান আছে সেগুলো হচ্ছে, সহজ, পরিষ্কার এবং মিথ্যা৷’’

এই উদ্ধৃতি থেকে বর্তমান পরিস্থিতির মোটামুটি সারসংক্ষেপ বুঝা যায়।

চলমান করোনা সংকট কি অভিবাসন সম্পর্কে ফরাসি জনগণের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছে? অনেক প্রথম সারির গুরুত্বপূর্ণ কাজ অভিবাসীদের দ্বারা পূরণ করা হয়েছে৷ তারা বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছেন৷

ফ্রঁসোয়া হেরান: স্বাস্থ্য সংকটের আগে পরিচালিত একটি সমীক্ষায়, দুই তৃতীয়াংশ ফরাসি মানুষ মনে করেছিলেন যে, ফ্রান্সে অনেক বেশি বিদেশি রয়েছে এবং তারা ফরাসি সমাজে যথেষ্ট সংহত বা ইন্টিগ্রেট হতে পারেন নি৷

২০২০ এর শরৎকালে, প্রথম লকডাউনের পরে এমন ধারণা করা লোকের সংখ্যা ৫০ শতাংশে নেমে এসেছিল৷ ইন্টিগ্রেশনের প্রশ্নেও লোকেদের অনুমান কমেছে৷ ফরাসিরা বুঝতে পেরেছে, অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় চাকরিতে ব্যাপক হারে উপস্থিত ছিল৷

কিন্তু এই ঘটনার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকবে কিনা বলা কঠিন৷

SHARE THIS ARTICLE