
আইরিশ বাংলাপোষ্ট অনলাইন ডেস্ক: বিনা প্রশ্নে নতুন শিল্পে বিনিয়োগ, পুঁজিবাজার, ফ্ল্যাট ও প্লট, ব্যাংক আমানতসহ বেশ কয়েকটি খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রেখে জাতীয় সংসদে স্থিরীকৃত অর্থবিল ২০২১ পাস করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে আবারো অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে জরিমানার পরিমাণ। এছাড়া নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফএস) ওপর বাড়তি যে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটিও বাদ দেয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৩ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত অর্থবিলে এসব সংশোধনী আনার কথা জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে তা আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য পাস হয়। বিলটি পাসের সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। আজ জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার প্রচলিত নিয়মের বাইরেও বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে জরিমানা ও শর্ত বাড়িয়ে প্রশ্ন ছাড়া বিশেষ সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পাস হওয়া অর্থবিলে আগামী অর্থবছরে পুঁজিবাজারে প্রশ্নাতীতভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ সুযোগ নিতে তালিকাভুক্ত শেয়ার, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটসহ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কর ও মোট করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা গুনতে হবে।
নতুন অর্থবিলে এসব সুযোগের পাশাপাশি আগের ঘোষণা অনুযায়ী, হাইটেক পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এবং জমি ও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এমন সুযোগ থাকছে।
অবশ্য এর আগে ৩ জুন প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারসহ বেশ কয়েকটি খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা প্রশ্নে বৈধ করার অবাধ সুযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। প্রস্তাবিত অর্থবিলেও তখন এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ না থাকায় কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ শেষ হচ্ছে বলে আলোচনা তৈরি হয়। তবে বাজেট প্রস্তাবের পরদিন সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ রেখে তা বহাল রাখার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
এদিকে বাজেট ঘোষণার পর মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদাভাবে করপোরেট কর কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করে। এনবিআর প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন পর্যালোচনা করে এ খাতে করপোরেট কর কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোবাইল ব্যাংকিং সেবার করপোরেট কর প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়। সেটি কমিয়ে এখন ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। এদিকে হোটেল-রেস্তোরাঁর ভ্যাট ৭ শতাংশ থেকে নামিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
এবারের অর্থবিলে কর্মীদের বেতন পরিশোধে নতুন নিয়ম আনা হয়েছে। বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশে কর্মীদের বেতন-ভাতা ও সম্মানীর পরিমাণ ১৫ হাজার টাকার বেশি হলে তা ক্রসচেক বা ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে করার বিধান রয়েছে। তা না হলে এ খাতে ব্যয় করা অর্থ আয় হিসেবে দেখানো হয় না। আর আয় হিসেবে গণ্য করলে তা করযোগ্য হয়ে যায়। সংশোধিত অর্থবিলে এ সীমা ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
বিনিয়োগ সহজ ও উৎসাহী করতে শিল্পের কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে ক্রসচেকের শর্ত শিথিল করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ হাজার টাকার বেশি কাঁচামাল কিনলে সে ক্ষেত্রে চেকে লেনদেনের বিধান চালু আছে। এটি বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এখন থেকে ৫ লাখের কম টাকার কাঁচামাল কিনলে চেকে লেনদেনের বাধ্যবাধকতা থাকছে না। এতে শিল্প উদ্যোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।
এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় অর্থবিলের ওপর কয়েকজন সদস্যের আনা কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বাকিগুলো কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। পরে তিনি অর্থবিল পাসের অনুরোধ জানালে স্পিকার তা ভোটে দেন। উপস্থিত সদস্যদের কণ্ঠভোটে স্থিরীকৃত আকারে পাস হয় অর্থবিল।
নিজের দেয়া বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১২ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। এ সময়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৬৮৬ ডলার থেকে ৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ ডলারে। জিডিপির আকার ৯১ দশমিক ৬ বিলিয়ন থেকে প্রায় ৪ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৫ বিলিয়ন ডলারে। রফতানির পরিমাণ ১৪ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে প্রায় ৩ গুণ বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে সাড়ে ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৬ বিলিয়ন ডলার ছুঁই ছুঁই করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এত অল্প সময়ে এত বেশি পরিমাণ রিজার্ভ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড। তারপর প্রবাসী আয় ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে সাড়ে ৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার ছুঁই ছুঁই করছে। মাত্র এক বছরে প্রবাসী আয় খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলার অর্জন নিঃসন্দেহে আরো একটি অনন্য ঐতিহাসিক রেকর্ড।
মুস্তফা কামাল জানান, সারা বিশ্বই করোনা মহামারীর কারণে ঘাটতি বাজেট প্রণয়নের পথ বেছে নিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ বছর বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ সারা বিশ্বে অর্থনীতিতে ঘাটতি বাজেটের হার ৪১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। সারা বিশ্বের অর্থনীতি পাল্টে গেছে, লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বিশ্বে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যখন এমন করুণ, সে অবস্থায়ও বাংলাদেশের অর্থনীতি ততটা খারাপ হয়নি।