কোভিড-১৯ ভাইরাসের সাউথ আফ্রিকান ধরনের বিরুদ্ধে টিকার কার্য্যকরিতা নিয়ে সংশয়

 

ডাঃ জিন্নুরাইন জায়গীরদারঃ করোনা ভাইরাস জনিত মহামারী সারা বিশ্বকে বিপর্য্যস্ত করে রেখেছে এক বছরের বেশী সময় ধরে। এই সময়ে বেশ কয়েকবার এই ভাইরাস তার চরিত্র পরিবর্তন করেছে, যাকে আমরা মিউটেশন বলে থাকি। এই মিউটেশনের কারণে কোভিড ভাইরাসের নূতন ধরন পাওয়া যাচ্ছে। এই নূতন চরিত্রের ভাইরাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে গত বছরের শেষ নাগাদ দক্ষিণ আফ্রিকায় ধরা পড়া নূতন রূপ, যাকে আমরা সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটি বলছি। এই সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট, যা বি.১.৩৫১ নামেও পরিচিত ইতিমধ্যে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে একটি পরীক্ষায় ইদানীং সকল রোগীদের প্রায় ৮১% সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটি বলে শনাক্ত হয়েছে।

এই সাউথ আফ্রিকান ধরনের ভাইরাসে ডি এন এ’র দুই স্থানে পরিবর্তন হওয়ার কারণে এটি অন্যান্য ধরন থেকে অত্যন্ত দ্রুত সংক্রমিত করছে এবং যারা ইতিমধ্যে একবার সংক্রমিত হওয়ার কারণে শরীরে এন্টিবডি আছে কিংবা যারা টিকা নিয়েছেন তাদের শরীরের এন্টিবডি প্রতিক্রিয়াকে ব্যার্থ করে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এন ৫০১. ওয়াই হিসেবে পরিচিত প্রথম মিউটেশন শরীরের কোষের সাথে সহজেই সংযুক্ত হতে পারে বলেই এই ধরনটি  দ্রুত সংক্রমন ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। ই ৪৮৪ কে হিসেবে পরিচিত মিউটেশনের কারণে এই ভাইরাস শরীরের প্রতিরোধ ব্যাবস্থা অর্থাৎ এন্টিবডি প্রতিক্রিয়াকে ব্যার্থ করে দিতে সক্ষম বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক পরীক্ষায় মনে করা হচ্ছে এই ধরনটি অনেক বেশি সংখ্যক ভাইরাস বহন করে বিধায় সংক্রমণ করতে পারে দ্রুত। এছাড়া অন্যান্য কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই সাউথ আফ্রিকান ভাইরাস সংক্রমনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিলেও মারাত্নক অসুস্থ কিংবা মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবার কোন সম্ভাবনা এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। 

সকলের নিকট একটি প্রশ্ন এখন উকি ঝুঁকি দিচ্ছে আর তা হচ্ছে বিশ্বে যে বর্তমানে টিকার কার্য্যক্রম চলছে এসব টিকা কি আদৌ এই সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটিতে কার্যকর হবে কি না। সম প্রতি ইসরায়েলে পরিচালিত এক সমীক্ষ্যার প্রাথমিক প্রতিবেদনে মনে করা হচ্ছে যে, এই পরিবর্তিত ভাইরা ফাইজার বায়োনটেকের টিকাকে কিছুটা হলেও অকার্য্যকর করে দিতে সক্ষম অর্থাৎ এই টিকা এই ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে পূর্ন সফল না হতে পারে। এই পরীক্ষায় ইসরায়েলে প্রায় ৪০০ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে যারা হয় কোভিড টিকার একটি কিংবা দুটি ডোজ নেবার ১৪দিন পর নূতন করে সংক্রমিত হয়েছেন অথবা যারা আদৌ টিকা নেন নি। এই দুই গ্রুপে সমানসংখ্যক রোগী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বয়স এবং লিঙ্গের সাযুজ্য ছিল। 

এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করছে তেল আভিভ ইউনিভার্সিটি এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী সংস্থা ক্লালিট। তারা দেখতে পেয়েছে যে, সকল কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ১% ছিল সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটি। কিন্তু যারা ইতিমধ্যে দুটি ডোজ টিকা পেয়েছেন তাদের মধ্যে এই কোভিড সংক্রমণের প্রসার যারা টিকা গ্রহণ করেন নি তাদের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বেশি ছিল (৫.৪% বনাম ০.৭%) । এই গবেষণার প্রাথমিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, এই টিকা মূল ভেরাইটি কোভিড-১৯ কিংবা ইংল্যান্ডে আবিষ্কৃত নূতন ধরনের ভাইরাসের তুলনায় এই সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির বেলায় অনেক কম কার্য্যকর। এই পরীক্ষায় বলা হয়েছে যে, “যারা টিকা পান নি তাদের তুলনায় যারা টিকা পেয়েছেন তাদের বেলায় সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির সংক্রমণ ব্যাতিক্রমি হারে বেশী পেয়েছি, যা থেকে অনুধাবন করা যায় যে এই টিকার প্রতিষেধক ব্যাবস্থাকে ভাইরাসের এই ধরন বেশ কিছুটা ব্যার্থ করে দিতে পারে”। তবে বুঝতে হবে যে, ইসারায়েলে এই সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটি অতি স্বল্প সংখ্যায় আছে এবং এই পরীক্ষা কম সংখ্যক রোগীর বেলায় দেখা হয়েছে।পরীক্ষক দল এও বলেছেন যে, তাদের এই পরীক্ষা কোনভাবেই সকল ভেরিয়েন্টের বেলায় প্রতিষেধকের ক্ষমতা দেখা হয়নি এবং রোগীদের সকলেই ইতিমধ্যে কোভিড পজিটিভ হয়েছিলেন। আরও বুঝতে হবে যে, এই পরীক্ষাটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বেশ দুর্বল বিশেষ করে অন্য পরীক্ষক দল কর্তৃক তাদের এই পরীক্ষার যথার্থতা বিচার অর্থাৎ পিয়ার রিভিও করা হয়নি।

এই মাসের প্রথম দিকে ফাইজার বায়োনটেক কোম্পানির এক পরীক্ষার ফলাফলে দেখানো হয়েছিলো যে, সাউথ আফ্রিকাতে করা এই পরীক্ষায় ৮০০ জনের মধ্যে এই টিকার কার্য্যকরিতা তার দেখতে পেয়েছিলো, তারা দেখেছিলো শতভাগ ক্ষেত্রে এই টিকা এই রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম ছিলো, যদিও এই পরীক্ষায় রোগীর সংখ্যা যথেষ্ট ছিলোনা। এই টিকা নিয়ে অন্য একটি পরীক্ষায় এই সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির বিরুদ্ধে এই টিকার কার্য্যক্ষমতা কিছুটা কম বলে দেখানো হয়েছিলো। 

মোডার্না কোম্পানি থেকে জানানো হয়েছিলো যে, তাদের টিকা সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির জন্য কার্য্যকর। মোডার্নার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো যে, যদিও তাদের টিকা সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির বেলায় নিউট্রেলাইজিং এন্টিবডির পরিমাণ ৬ গুণ কম তৈরি করেছিলো যদিও প্রতিরক্ষা দেবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণের এন্টিবডি পাওয়া গিয়েছিলো। 

এদিকে, গবেষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির বেলায় এস্ট্রা জেনেকার টিকা মাত্র ১০% সুরক্ষা দিয়ে থাকে। জনসন এন্ড জনসনের টিকা ৮৫% ক্ষেত্রে মারাত্নক কোভিড-১৯ রোগ থেকে প্রতিরক্ষা দিতে পারে আর সকল ক্ষেত্রে ৫৭% সুরক্ষা দিতে পারে জানানো হয়েছে। 

পরিশেষে আমি বলতে চাই যে, এই সকল পরীক্ষার কোনটিই যথেষ্ট রোগীদের নিয়ে করা হয়নাই, আর এসকল ফলাফল আলাদা পরীক্ষক দ্বারাও পরিক্ষিত নয় তাই এসকল পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক মূল্য তেমন নেই বললেই চলে। তবে এসকল পরীক্ষা আমাদের সকলের জন্য সাবধানতা অবলম্বনের সংবাদ দেয়, অর্থাৎ ফাইজার বায়োনটেক কিংবা এস্ট্রা জেনেকার টিকা এই সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটির বেলায় যথেষ্ট প্রতিরোধী না হওয়ার সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই যারা ইতিমধ্যে টিকা নিয়েছেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ, “আপনারা কোনভাবেই নিজেদেরকে সম্পুর্ন সুরক্ষিত ভাববেন না”, বিশেষ করে সাউথ আফ্রিকান ভেরাইটি আপনাদের জন্য যথেষ্ট সুরক্ষা না দেবার পক্ষে বেশ কিছুটা ফলাফল পাওয়ায় আপনাদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।  তাই সকলেই মৌলিক সাবধানতা অর্থাৎ দূরত্ব বজায় রাখা, মুখবন্ধনী ব্যাবহার করা, হাত ধৌত করন অব্যাহত রাখুন।

মূল তথ্যসূত্রঃ সি এন বি সি, বি বি সি, আল জাজিরা, ফরবিস, রয়টার্স

SHARE THIS ARTICLE