মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামি ভবন ধসে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ১৬৯

আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামি শহরে ভবন ধসে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ১৬৯-এ পৌঁছেছে। এদের মধ্যে চার জন মৃত বলে নিশ্চিত হয়েছেন উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা। এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।

বুধবার রাত ১ টার দিকে মিয়ামির উত্তরাংশের সার্ফসাইড এলাকায় আকস্মিকভাবে ধসে পড়ে চ্যাম্পলাইন টাওয়ার নামের ১২ তলা ওই আবাসিক ভবনের অর্ধেক অংশ। ১৯৮০ সালে নির্মিত সেই ভবনটিতে ১৩০ টি ইউনিট ছিল। ধসের ফলে ১৩০ টি ইউনিটের অর্ধেক, অর্থাৎ ৬৫ টি ইউনিটই তছনছ হয়ে গেছে।

মিয়ামি-ডাড শহরের মেয়র ড্যানিয়েলা লেভিন কাভা যদিও বলেছেন, তিনি এখনও আশাবাদী ভবনটিতে আটকা পড়া অধিকাংশই এখনও জীবিত আছেন এবং এখনও জীবিত অবস্থায় তাদের উদ্ধারের আশা আছে, তবে সময় যত যাচ্ছে, ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে সেই আশা।

উপরন্তু, টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়াজনিত কারণে উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সার্ফসাইডের মেয়র চার্লস বারকেট শুক্রবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভবনের পেছনের দিকে, এক তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি অংশ সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।’

তিনি আরো জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় ভবনটির ধসে পড়া অংশে অংশে ঠিক কতোজন ছিলেন, তা এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে এখন পর্যন্ত সেখান থেকে ১৫ টি পরিবারের সদস্যদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

উদ্ধারকাজের অংশ হিসেবে ভবনের সব বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বৃহস্পতিবার রাত থেকেই দেশটির কেন্দ্রীয় জরুরি অবস্থা কর্তৃপক্ষ ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (এফইএমএ)- এর সদস্যরা মায়ামির দমকল বাহিনীর কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন।

শুক্রবার মায়ামি-ডাডের মেয়র ড্যানিয়েলা লেভিন কাভা এক বার্তায় বলেন, ‘আমরা উদ্ধার তৎপরতা ও নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাব, কারণ এখনও তাদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধারের আশা আছে।’

এদিকে মায়ামি-ডাড ও এফইএমএ-এর সদস্যরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ৩৫ জনকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। দশজনকে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেয়া হয়েছে; এবং দুইজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে বিবিসির উইল গ্রান্ট বলেছেন যে ভেঙে পড়া ভবন থেকে কয়েক ব্লক দূরে একটি কমিউনিটি সেন্টারে নিখোঁজদের স্বজনরা জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছেন তাদের প্রিয়জনের অবস্থা জানার জন্য।

বেশিরভাগেরই কোনো না কোনো স্বজন আছেন নিখোঁজদের তালিকায়। ফলে, স্বাভাবিভাবেই চরম উৎকণ্ঠা কাজ করছে তাদের মধ্যে।

নিকোলাস ফার্নান্দেজ নামে এক ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। বারবার ফোন করছেন তার স্ত্রীর নাম্বারে, তাতে রিং-ও হচ্ছে; কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না।

মার্কিন সংবাদ সংস্থা সিবিএসকে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, তারা আর কেউ বেঁচে নেই। আমি আর আশাবাদী থাকতে পারছি না।’

জেনি আর্গেলস নামে এক তরুণী বিবিসিকে জানিয়েছেন, তার বাবা-মা ওই ভবনটিতে ছিলেন, কর্মসূত্রে তিনি থাকেন মিয়ামির অপর এলাকায়। বৃহস্পতিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভবন ধসের সংবাদ পেয়ে সাইডসার্ফে ছুটে এসেছেন তিনি।

বাবা ও মা উভয়ের মোবাইল ফোনেই তিনি ফোন করেছিলেন, ফোনে রিং হলেও কেউ তা ধরছে না। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি এখনও আশা ধরে রেখেছি। উদ্ধার তৎপরতার হালনাগাদ তথ্য জানার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’

যারা নিখোঁজ হয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন লাতিন আমেরিকান অভিবাসী রয়েছেন বলে ওই দেশগুলোর কনস্যুলেট থেকে জানানো হয়েছে।

প্যারাগুয়ের ফার্স্ট লেডি সিলভানা লোপেজ মোরেইরার বোন, বোনের স্বামী, তাদের তিন সন্তান ও গৃহকর্মীও নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। তবে তাদের কারো সম্পর্কেই এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য জানা যায়নি।

মায়ামি-ডাডের দমকল বাহিনীর প্রধান রাইদে জাদাল্লাহ বিবিসিকে জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নীচে কোথাও কেউ আছে কিনা – সেটা অনুসন্ধানের জন্য তারা সোনার সিস্টেম, অনুসন্ধানী ক্যামেরা পাশাপাশি বিশেষত প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করছেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিসান্টিস, অগ্নিকাণ্ড ও উদ্ধারকাজ এখনও তল্লাশি ও উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “এরকম বিশাল ভবন ধসে যাওয়া সত্যিই বেদনাদায়ক।’

বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, “আমি ফ্লোরিডার জনগণকে বলছি, কেন্দ্রীয় সরকার দিতে পারে এমন সব সহায়তা আপনারা চাইতে পারেন, আমরা অপেক্ষা করছি, কেবল আমাদের জানান। আমরা সেখানে থাকব।”

যে কারণে ধসে পড়েছিল ভবনটি

ভবনটি ধসে পড়ার সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি।ে মায়ামি-ডাডের মেয়রের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, উদ্ধার তৎপরতা শেষে এ বিষয়ক অনুসন্ধান শুরু হবে।

তবে কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৮০ সালে নির্মিত এই চ্যাম্পলাইন টাওয়ার রিসার্টিফিকেশন বা এর বৈধতাসংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়েনের প্রক্রিয়ায় ছিল এবং ভবনটিতে মেরামত কার্যক্রম চালানো জরুরি ছিল।

ফ্লোরিডা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গত বছরের একটি গবেষণা বলছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রতিবছল ভবনটি দুই মিলিমিটার করে মাটিতে দেবে যাচ্ছিল। তবে পরে গবেষকরা বলেছিলেন- এটি ছিল একটি খসড়া প্রতিবেদন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভবন নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল নরম ও জলা জায়গার ওপর। ফলে সবসময়ই ঝুঁকিতে ছিল ভবনটি এবং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে থাকে।

‘৯/১১-এর মতো দেখে মনে হয়েছিল’

১২ তলা চ্যাম্পলাইন টাওয়ারগুলির অবস্থান ৮৭৭৭ কলিন্স অ্যাভিনিউতে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মায়ামি সমুদ্র সৈকতের উত্তরে সার্ফসাইড শহরে এই কলিনস অ্যাভিনিউ।

স্থানীয় প্রত্যক্ষ্যদর্শী জানিয়েছেন, তিনি ভবনটি ধসে পড়ার শব্দ শুনতে পেয়েছেন। মার্কিন সংবাদ সংস্থা সিবিএসকে তিনি বলেন, ‘আমি একটা গমগম শব্দ শুনেছিলাম এবং ভেবেছিলাম হয়তো কোন মোটরসাইকেলের শব্দ। ঘুরে তাকাতেই দেখলাম একটা ধুলোর কুণ্ডলি আমাদের দিকে আসছে।’

‘আমাদের একটা কথাই মনে হচ্ছিল যে এসব ‘কি হচ্ছে?’ আমরা আমাদের শার্ট দিয়ে মুখ ঢেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই এবং নিরাপত্তা কর্মীকে দেখে জিজ্ঞেস করি, ‘কী হয়েছে?’ উত্তরে তিনি বলেন যে ভবনটি ধসে গেছে।’

প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলে ধ্বংসস্তূপ দেখে সিএনএনকে জানান যে, ‘দেখে মনে হয়েছিল ৯/১১ এর মতো ঘটনা।’ ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টুইন টাওয়ারে হামলার পর সেটিও ধসে পড়েছিল।

৫০ বছর বয়সী সান্টো মেজিলের স্ত্রী একজন বয়স্ক প্রতিবন্ধী নারীর রাত্রীকালীন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন।।

তিনি চ্যাম্পলাইন টাওয়ারের তিনটি বিল্ডিংয়ের একটির নবম তলায় কাজ করতেন। ওইদিন রাতে তার ফোন কল পেয়ে জেগে ওঠেন সান্টো মেজিল। এরইমধ্যে ভবনটি ধসে পড়ে।

স্থানীয় পত্রিকা মায়ামি হেরাল্ডকে সেই অভিজ্ঞার বিষয়ে মেজিল বলেন, ‘ আমার কাছে মনে হচ্ছিল বুঝি ভূমিকম্প হচ্ছে।’

ধসে পড়া ভবনটি পাশের এক বাসিন্দা সিবিএসের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: ‘বিল্ডিং কাঁপতে লাগল এবং তারপরে আমি জানালার বাইরে তাকালাম এবং কিছু দেখতে পারলাম না, আমি ভেবেছিলাম ঝড়ের মতো কিছু হয়েছে।’

‘ধুলো পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর দেখি এতো বড়, ভবনের পিছনের দুই-তৃতীয়াংশ ধসে পড়েছে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

SHARE THIS ARTICLE