আফগানিস্তানে আর সংঘাত চায় না তালেবান,তারা সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছে

আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ আর সংঘাত চায় না তালেবান। দেশের ভেতর ও বাইরে আর কাউকে শত্রু হিসেবে চায় না। তারা সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছে।

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। কাবুলে এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তালেবানের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

তালেবান বলেছে, তারা কোনো প্রতিশোধ নেবে না। আফগানিস্তানের মাটি সন্ত্রাসের কার্যকলাপে ব্যবহার করতে দেবে না। নারীদের পড়াশোনা ও কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনতা পাবে। তাদের সরকার পরিচালিত হবে ইসলামি মূল্যবোধে।

তালেবানের প্রতিশ্রুতি

  • নারীদের পড়াশোনা ও কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। হিজাব পরতে হবে, বোরকা বাধ্যতামূলক নয়।
  • আফগানিস্তানের ভূমি সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
  • সরকার পরিচালিত হবে ইসলামি মূল্যবোধে।

তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় গত রোববার। এক দিন বাদে গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যার পর কাবুলের সরকারি একটি দপ্তরে যখন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, তার আগেই সরকার গঠনের আলোচনা শুরু করে দিয়েছে তালেবান। গোষ্ঠীটির জ্যেষ্ঠ নেতা আমির খান মুত্তাকি কাবুলে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এবং সমঝোতা আলোচনার প্রধান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তালেবান নেতাদের বাইরের অন্যদের নিয়ে সরকার গঠনের লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, সরকার গঠনের বিষয়ে তাঁরা কাজ করছেন। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই ঘোষণা দেওয়া হবে। আর সরকার গঠনের পরই কোন আইনে দেশ পরিচালনা করা হবে, সেই ঘোষণা দেওয়া হবে।

সরকার গঠনের আলোচনা শুরু। নতুন সরকারে অন্যদেরও রাখতে চায় তালেবান। তারা প্রতিশোধ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে

‘আমরা শত্রু চাই না’

সংবাদ সম্মেলনে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘আমরা সংঘাতের পুনরাবৃত্তি চাই না, আর যুদ্ধ চাই না। শত্রুতা শেষ হয়েছে। আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। দেশের ভেতর ও বাইরে কোনো শত্রু চাই না।’

দেশে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের সদস্য ও আফগান বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তালেবান মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। কেউ আপনার ক্ষতি করবে না। কেউ আপনার দরজায় কড়া নাড়বে না।’

আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে। তালেবান মুখপাত্র এ প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি বলেন, নারীরা লেখাপড়া ও কাজ করার সুযোগ পাবেন। তাঁরা সমাজে খুবই সক্রিয় থাকবেন। তবে তার সবই হবে ইসলামি কাঠামোর মধ্যে থেকে।

সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। একটি প্রশ্ন ছিল আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে। এর জবাবে জাবিউল্লাহ মুজাহিদ স্পষ্টভাবেই বলেন, আফগানিস্তানের ভূমি ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।

আরেকটি প্রশ্ন ছিল, ২০ বছর আগের তালেবানের সঙ্গে বর্তমান তালেবানের তফাত কী, জবাবে জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, মতাদর্শ ও বিশ্বাসের দিক দিয়ে কোনো তফাত নেই। যদি অভিজ্ঞতা, পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার কথা বলেন, নিঃসন্দেহে অনেক তফাত আছে। অতীতের থেকে এখনকার অবস্থান ভিন্ন হবে।

তালেবান মুখপাত্র আরও বলেন, বেসরকারি সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। তবে সংবাদমাধ্যমের তালেবানের বিরুদ্ধে কাজ করা উচিত হবে না। আফগানিস্তানে আফিম চাষ বন্ধ করে দেশকে মাদকমুক্ত করা হবে। এ বিষয়ে মুখপাত্র আফিম (পপি) চাষের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের জন্য বিকল্প চাষাবাদে সহায়তা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

কাবুলে তালেবানের সংবাদ সম্মেলনের কাছাকাছি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়, কাবুল থেকে নাগরিকদের উদ্ধার তৎপরতায় কোনো বাধা দেয়নি তালেবান। রোববার দোহায় তালেবান নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধানের বৈঠকের পর শত্রুতামূলক কিছু ঘটেনি।

আফগানিস্তান পরিস্থিতি ও সরকার নিয়ে গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সৌদি আরব ও পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া জানায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা আফগানিস্তানের সঙ্গে কাজ করবে, যদি তালেবান মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান জানায়, নারীর অধিকার রক্ষা করে এবং নিজ ভূখণ্ড সন্ত্রাসবাদে ব্যবহার করতে না দেয়।

সৌদি গেজেট গত রাতে এক প্রতিবেদনে জানায়, সৌদি আরবের মন্ত্রিসভা গতকাল এক বৈঠক করে। এতে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মন্ত্রিসভা আফগানিস্তানের জনগণের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি আফগানিস্তানের পরিস্থিতি গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।

এদিকে পাকিস্তানে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর দেশটির তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী বলেন, তাঁরা এককভাবে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেবেন না। আঞ্চলিক সহযোগী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কানাডা বলেছে, সম্ভাব্য তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবছে না। জার্মানি আফগানিস্তানে উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে।

কে হতে পারেন তালেবান নেতা

তালবানের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান আবদুল গনি বারাদার। তিনি মোল্লা বারাদার হিসেবে বেশি পরিচিত। তিনিসহ অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা গতকাল আফগানিস্তানে ফিরেছেন। তালেবান প্রতিষ্ঠাতাদের একজন বারাদার প্রয়াত তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের সঙ্গে আশির দশকে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ২০১০ সালে পাকিস্তানে আটক হয়ে কারাবন্দী ছিলেন। ২০১৮ সালে মুক্তি পেয়ে কাতারে চলে যান। সেখান থেকে তালেবানের হয়ে সমঝোতা আলোচনায় নেতৃত্ব দেন তিনি। তালেবান এখনো তাদের নেতার নাম ঘোষণা করেনি। তবে বারাদারই এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর আসছে।

‘বোরকা বাধ্যতামূলক নয়’

কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক দপ্তরের মুখপাত্র সোহাইল শাহিন গতকাল বলেন, আফগানিস্তানে নারীদের বোরকা বাধ্যতামূলক করা হবে না। তবে তাদের হিজাব পরতে হবে। তিনি বলেন, নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

তালেবান রোববার আফগানিস্তানের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলের পর্দায় আর নারীদের দেখা যায়নি। তবে গতকাল একটি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাকক্ষে হিজাব পরা অবস্থায় এক নারীকে বৈঠকে অংশ নিতে দেখা যায়। তালেবানের সাংস্কৃতিক কমিশনের সদস্য এনামুল্লাহ সামাঙ্গানি গতকাল বলেন, এই ইসলামিক আমিরাত নারীদের ভিকটিম (ভুক্তভোগী) বানাতে চায় না।

কাবুলে আতঙ্ক কমেনি

কাবুলে এখনো আতঙ্ক কাটেনি। দেশ ছাড়তে মরিয়া মানুষ বিমানবন্দরে অপেক্ষায়। কাবুল থেকে বিবিসির প্রতিবেদক মালিক মুদাচ্ছির জানান, মানুষের আশঙ্কা, পরিস্থিতি যেকোনো সময় খারাপের দিকে যেতে পারে। সে কারণে তাঁরা পারতপক্ষে ঘর থেকেই বেরোচ্ছেন না। মুদিদোকানগুলো খোলা থাকলেও বিপণিবিতানগুলো এখনো বন্ধ। পুরো শহরের নিরাপত্তা, এমনকি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়েছেন তালেবান যোদ্ধারা। শহরের প্রতি মোড়-চত্বরে রয়েছে তাঁদের উপস্থিতি।

তাঁরা কেন এখানে এবং তাঁদের কাজটাই-বা কী, তা জানতে চেয়েছিলেন বিবিসির সাংবাদিক। জবাবে তালেবান সদস্যরা বলেন, তাঁরা শহরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন।

কাবুল থেকে উড়োজাহাজে আফগানদের দেশ ছাড়ার একটি ছবি বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। বহু আফগান নিজের দেশ থেকে পালিয়ে যেতে কতটা মরিয়া, তার প্রতীকী রূপ হয়ে উঠেছে ওই ছবি। রোববার তালেবান রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সি-১৭ নামের একটি উড়োজাহাজে চড়ে বসেন কয়েক শ আফগান নারী-পুরুষ। তাঁদের নিয়েই যাত্রা করে উড়োজাহাজটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিউজ ওয়েবসাইট ডিফেন্স ওয়ানের তথ্যমতে, উড়োজাহাজে ৬৪০ জন উঠেছিলেন। এত বিপুলসংখ্যক আরোহী নিয়ে এর আগে কখনো ওড়েনি কোনো সি-১৭ ক্যারিয়ার।

রণার্থী ঢলের শঙ্কা

আফগানিস্তান থেকে শরণার্থীদের ঢল নামার শঙ্কায় উদ্বেগ জানিয়েছেন ইউরোপের নেতারা। গত সোমবার এক টেলিভিশন ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ইউরোপের দেশগুলোকে বড় ধরনের অভিবাসীর ঢল থেকে নিজেদের রক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমান অবস্থার পরিণতি ইউরোপ একা বহন করতে পারে না। আফগানিস্তান থেকে বড় ধরনের অভিবাসীর ঢল মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ বিষয়ে আলোচনায় বসছেন।

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হোর্স্ট সেহোফারের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম বলছে, আফগানিস্তান থেকে ৫০ লাখের মতো মানুষ পালিয়ে আসতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।

এর আগে ২০১৫ সালে সিরিয়া যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক লাখ শরণার্থীর জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল জার্মানি। তবে এবার ‘২০১৫-এর পুনরাবৃত্তি উচিত হবে না’ বলে টুইট করেছেন দেশটির ক্ষমতাসীন দল সিপিইউর নেতা ও চ্যান্সেলর পদপ্রত্যাশী আরমিন ল্যাশেট।

ইউরোপের আরেক দেশ গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী নোটিস মিটারাচিও একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, আরেকটি চাপ এড়াতে গ্রিস সরকার সীমান্ত সুরক্ষিত করেছে।

এদিকে আফগানিস্তান থেকে শরণার্থী ঠেকাতে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করছে তুরস্ক। আফগানিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সরাসরি সীমান্ত নেই, রয়েছে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে। ইরানের সঙ্গে লাগোয়া সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে তুরস্ক।বিজ্ঞাপন

আশরাফ গনি কোথায়?

তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে ঢুকে পড়ার দিন রোববার দেশত্যাগ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। তিনি কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, তাজিকিস্তান নামার অনুমতি না দেওয়ার পর ওমানে গিয়েছিলেন আশরাফ গনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে আশরাফ গনি বলেছিলেন, রক্তপাত এড়াতে দেশ ত্যাগ করেছেন তিনি। তবে তিনি এখন কোথায় আছেন, তা উল্লেখ করেননি আশরাফ গনি।

SHARE THIS ARTICLE