বিএনপিকে যা করতে হবে: খন্দকার মোশাররফ হোসেন

আইরিশ বাংলাপোষ্ট অনলাইন ডেস্কঃ বাংলাদেশে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

বহু চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দলটি বর্তমানে জনগণের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা এবং গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার মৌলিক লক্ষ্য নিয়ে এ দলের জন্ম। নয়া উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদের কবল থেকে মুক্ত করে স্বনির্ভর এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত রচনা করে একটি আধুনিক ও উন্নত দেশে রূপান্তরিত করা ছিল বিএনপির অঙ্গীকার। বিএনপির দর্শনের উপাদান ছিল মধ্যপন্থি উদার গণতন্ত্র, উৎপাদনের রাজনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন, স্বনির্ভর জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদভিত্তিক ইস্পাতকঠিন গণঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতা অর্জনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো পর্যায়ক্রমে ধ্বংস করে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। রক্ষীবাহিনী সৃষ্টি করে সামরিক বাহিনীর গুরুত্বকে ধ্বংস করে দেয়। শুরু হয় অত্যাচার ও দুঃশাসন। ১৯৭৪ সালে দেশ দুর্ভিক্ষে নিপতিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা খর্ব করে ৪টি সরকারি সংবাদপত্র ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়। দেশের সব রাজনৈতিক দল (আওয়ামী লীগসহ) নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এমনি প্রেক্ষাপটে বহুদলীয় গণতন্ত্রের শপথে ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের নেতৃত্বে বিএনপি একটি জনপ্রিয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে ‘সিপাহি জনতার’ বিপ্লবের মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন। তিনি সর্বপ্রথম দেশে বিরাজমান সাংবিধানিক বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধান দেন। তিনি বাংলাদেশের জনগণের পূর্ণাঙ্গ জাতিসত্তার পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করেন। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পরিবর্তে ন্যায়ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ব্যক্তি উদ্যোগকে প্রাধান্য দিয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির দরজা উন্মুক্ত করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান প্রদর্শন করে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সন্নিবেশিত করেন। শহীদ জিয়ার ‘কৃষি বিপ্লব ও খাল খনন কর্মসূচি’ গ্রহণের ফলে দেশ অল্প সময়ে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। তার জীবদ্দশায় বাংলাদেশ থেকে চাল রপ্তানি হয়েছিল। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ উপাধি দিয়েছিলেন। সে দেশকে রাষ্ট্রপ্রতি জিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থান করে দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সমর্থ হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান যে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছে জিয়ার শাহাদাতবরণের পর ঢাকায় অনুষ্ঠিত নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক জানাজায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে দেশ বিনির্মাণে আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতারা যেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি সফল।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতবরণের পর অনেক রাজনৈতিক পণ্ডিত মন্তব্য করেছিলেন, ‘জিয়াবিহীন বিএনপি শূন্যে পরিণত হবে।’ কিন্তু শহীদ জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি খালেদা জিয়া বিএনপির পতাকাকে উড্ডীন রেখে, সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে জনগণের ভোটে তিনবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন। বিএনপিকে ধ্বংস বা দুর্বল করার জন্য বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বৈরশাসক এরশাদ ‘হুদা-মতিন’কে দিয়ে বিএনপি দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। শাহ আজিজকে দিয়ে বিকল্প বিএনপি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১/১১-এর জরুরি আইনের সরকার ‘সংস্কারপন্থি’ সৃষ্টি করে বিএনপিকে ভাঙতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সবার অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির সুমহান আদর্শ, দর্শন ও গণমুখী কর্মসূচি দেশের জনগণের কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হওয়ায় দলটি দিন দিন আরও জনপ্রিয় ও শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। আর সে কারণেই বিগত সাধারণ নির্বাচনে গায়ের জোরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভোটের আগের রাতেই ভোট ডাকাতি করেছে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান ভোটবিহীন সরকার বিএনপিকে দুর্বল করার হীন উদ্দেশ্যে ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে দুটি মিথ্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে সাজা দিয়েছে। খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গৃহবন্দি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে একইভাবে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে বিদেশে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। বিএনপির প্রায় ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লক্ষাধিক রাজনৈতিক মামলা দিয়ে স্টিমরোলার চালানো হচ্ছে। গুম, হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে বিএনপি ও দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু হাজারো নির্যাতন, ভয়ভীতি এবং বহুমুখী প্রতিবন্ধকতার মাঝেও দলটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
জনবিচ্ছিন্ন বর্তমান একনায়কত্বের সরকার দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে দেশকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশে সুশাসন নেই, সামাজিক স্থিতিশীলতা নেই, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নেই, আইনের শাসন নেই এবং বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা নেই। সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি, দুঃশাসন, অযোগ্যতা, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থার কাহিনি সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রচারিত হচ্ছে। বিশ্ব মহামারি করোনা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধেও সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুতে নমুনা পরীক্ষা, রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা, আইসিইউ সুবিধা ও অক্সিজেনের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। করোনা প্রতিরোধে নমুনা পরীক্ষায় কেলেঙ্কারি, পিপিই সরঞ্জাম সরবরাহে দুর্নীতি এবং টিকা ক্রয়, টিকাদান কর্মসূচিতে চরম অব্যবস্থাপনার ফলে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
সরকার তাদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতিকে ধামাচাপা দিতে এবং জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার হীন উদ্দেশ্যে আবারও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও বিএনপির বিরুদ্ধে জঘন্য অপপ্রচার শুরু করেছে। স্বাধীনতার ঘোষক ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান কোথায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন- তা প্রধানমন্ত্রী জানেন না বলে দাবি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে জিয়ার অর্জিত ‘বীরউত্তম’ উপাধি কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। শহীদ জিয়ার লাশ সংসদ ভবন এলাকায় জিয়ার মাজারে নেই বলেও নতুন তত্ত্ব দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এসব আজগুবি ও মনগড়া কথা কেউ বিশ্বাস করে না। যারা এ ধরনের মিথ্যা কথা বলছেন, তারাই বরং জনগণের কাছে হাসির পাত্র হচ্ছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে কল্পকাহিনি রচনা করা যায়, কিন্তু ইতিহাস রচনা করা যায় না। এটা সরকারের বিভিন্ন মহলের অজানা থাকার কথা নয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের দল। শহীদ জিয়া ‘বাকশালের’ অন্ধকার গহ্বর থেকে দেশকে রক্ষা করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছেন। সংসদ নির্বাচন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে সন্নিবেশিত করেছিলেন। দেশে বর্তমানে গণতন্ত্র নেই। যারা বারবার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে, তাদের দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই বিএনপির প্রতি জনগণের প্রত্যাশা বেশি। বাংলাদেশ বর্তমানে যে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে, এখান থেকে উত্তরণে বিএনপিকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি গণআন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। করোনা-পরবর্তীকালে বিশ্বের সর্বত্র এক ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হবে না। কাঙ্ক্ষিত এ পরিবর্তন যেন ইতিবাচক এবং গণতন্ত্র ও জনগণের পক্ষে হয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্বে জনগণের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য সৃষ্টি খুবই অপরিহার্য। এ মহান দায়িত্ব বিএনপিকেই পালন করতে হবে।
সাবেক মন্ত্রী, সিনিয়র সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিএনপি এবং সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ভূ-তত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE THIS ARTICLE