
ডাঃ জিন্নুরাইন জায়গীরদারঃ কোভিড চিকিৎসায় একটি ঔষধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্তর্বর্তিকালীন ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক বলে প্রকাশিত হয়েছে। গুরুতরভাবে কোভিডে আক্রান্তদের জন্য পরীক্ষামূলক এই এন্টিভাইরাল ঔষধ মলনুপিরাভির, হাসপাতালে ভর্তি বা মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয় বলে অন্তর্বতীকালিন ফলাফলে দেখা গিয়েছে। সম্প্রতি পরিচালিত পরীক্ষায় কোভিড আক্রান্ত রোগীদের এই ঔষধ ট্যাবলেট আকারে দিনে দুবার দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারক মার্ক জানিয়েছে যে, এর ফলাফল এত ইতিবাচক যে, পরীক্ষকরা দ্রুত এই ট্রায়াল বন্ধ করতে উপদেশ দিয়েছেন। মার্কিন ঔষধ নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা অনুমোদিত হলে, মোলনুপিরভির হবে কোভিড-১৯ এর জন্য প্রথম মুখে খাবার অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ। ইনফ্লুয়েঞ্জার চিকিৎসার জন্য তৈরি করা এই ট্যাবলেট ভাইরাসের জেনেটিক কোডে ত্রুটি তৈরি করবে, যার ফলে ভাইরাস তার কার্য্যক্ষমতা হারিয়ে মানব শরীরে ছড়িয়ে পড়তে বাধাগ্রস্থ করবে।প্রাথমিক গবেষণায় ৭৭৫ জন রোগীকে এই পরীক্ষার অন্তর্গত করা হয়েছিলো, অন্তর্বতী ফলাফলে দেখা গিয়েছে, যারা মলনুভিরাপির পেয়েছেন তাদের মাত্র ৭.৩% হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু যারা প্লাসেবো (ডামি) ট্যাবলেট পেয়েছিলেন তাদের ১৪.১% হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মলনুপিরাভির যারা পেয়েছেন তাদের কেউ মৃত্যুবরণ করেন নি কিন্তু যারা প্লাসেবো পেয়েছেন তাদের মধ্য থেকে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও ফলাফলের পিয়ার-রিভিউ করা হয়নি, তাই এই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এখনো সুনিশ্চিত নয়। মার্ক কোম্পানি জানিয়েছে যে, তারা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঔষধটি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা ডাঃ অ্যান্টনি ফাউসি বলেছেন, ফলাফল "খুব ভালো খবর", কিন্তু মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) তথ্য পর্যালোচনা না করা পর্যন্ত সাবধানতার আহ্বান জানিয়েছে।
এই ঔষধ বাজারজাত করা গেলে কোভিড চিকিৎসায় এক নূতন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রথমত রেমডিসিভির নামক ঔষধরে কার্য্যকারিতা আগে পাওয়া গিয়েছিলো কিন্তু সেই ঔষধ রক্তে (ইন্ট্রাভেনাস) দিতে হতো এবং সেটা আগেভাগে না দিলে তেমন সফলতা পাওয়া যাচ্ছিলোনা। নূতন এই ঔষধটি মুখে খাবার ট্যাবলেট এবং ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশ্বে যখন কোভিড টিকা সফলতার নিকটবর্তী হয়েছে, সংক্রমণ কমে আসছে, হাসপাতালে ভর্তি কমে এসেছে মৃত্যুও কমে এসেছে। এই মুহূর্তে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের একটি বিরাট অংশ টিকা গ্রহণ করেন নি আর একটি অংশ টিকা গ্রহণের পর ও আক্রান্ত হচ্ছেন। এখন এই মুখে খাবার ট্যাবলেট যদি আক্রান্তদের ৫০% শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হবার সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে আর মৃত্যুও কমিয়ে দিতে পারে তাহলে কোভিডের নিয়ন্ত্রণ আরও সফলতা পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষভাবে যে সকল দেশ টিকা এখনো জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন নি সে সকল দেশের জন্য এই ঔষধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখা দেবে। এই ঔষধ বাজারে এলে আরও কয়েকটি ঔষধ যারা এখনো গবেষনার ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন তাদের সফলতার আশাও বৃদ্ধি পাবে।
নূতন একটি ঔষধের কার্য্যকারিতা জানা গেলে ঔষধটির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কতটুকু সেটাও জানা গুরুত্ত্বপূর্ন। মার্ক কোম্পানির পক্ষ থেকে যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখানো হয়েছে যে যারা মলনুপিরাভির পান নি তাদের অসুস্থতা বেশী হয়েছে এবং যারা মলুনুপিরাভির পেয়েছেন তাদের সুস্থতার মাত্রা অধিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তেমন মনে করা হচ্ছেনা। আরেকটি সমস্যা দেখা গুরুত্ত্বপূর্ন যে, যেহেতু এই ঔষধটি ভাইরাসের জিনে পরিবর্তন সাধন করে তাহলে মানুষের কোষে কোন সমস্যা করে কি না? চিকিৎসা জগতের সকলেই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পর্য্যবেক্ষন করছেন। ব্যাবসায়ী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ষ্টক মার্কেটে পরিবর্তন ঘটেছে। থাইল্যান্ড সহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে মার্ক কোম্পানির সাথে আগাম চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ১৭ লক্ষ রোগীকে ব্যাবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে নিয়েছে যার মূল্য পড়েছে প্রতি রোগীর পাঁচ দিনের চিকিৎসার জন্য ৭০০ ডলার। তথ্যসূত্রঃ মার্ক কোম্পানি, রয়টার, বিবিসি, সি এন এন, আর টি ই