
ফকির আলমগীর: ১৯৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চ মাসে আমরা সারা শহরে গণসংগীতের মাধ্যমে সংগ্রামী জনতার সঙ্গে রাখিবন্ধন করি। তারপর রেসকোর্স ময়দানে সেই ঐতিহাসিক জনসভায় অংশ নেওয়া জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। স্বাধীনতার দাবিতে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে, অসহযোগ আন্দোলন অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে।
আমার এখনো মনে আছে ২৩ মার্চ ডিআইটিতে অবস্থিত টেলিভিশন কেন্দ্র থেকে আমরা গণশিল্পী গোষ্ঠীর ব্যানারে মুস্তাফিজুর রহমানের প্রযোজনায় এক ঘণ্টার একটি প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করি। ঠিক সেই মুহূর্তে এই অনুষ্ঠানটি বেশ সাড়া জাগায়। কিন্তু শাসক শোষক গোষ্ঠী বাঙালির সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারপর ক্র্যাকডাউন যেদিন হলো, সে সময় আমি খিলগাঁওয়ে ছিলাম। ২৫ মার্চ কাল রাত। পিলখানা, রাজারবাগসহ সারা শহর যেন কেঁপে উঠল গুলির শব্দে। কোথাও কোথাও প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা হলো। সবার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কারফিউ চলছিল। সর্বত্রই একটা ত্রাস, আতঙ্ক, চারদিকে চলছিল নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। এমনি সময়ে বাসায় আমি ছিলাম, তাই দুই রাত এলাকার অন্যান্যের সঙ্গে খিলগাঁয়ের অদূরে মেরাদিয়া গ্রামে পালিয়ে ছিলাম। তারপর ২৭ তারিখ কারফিউ তুলে নেওয়া হলে শহরে অনেকের কাছ থেকে শুনলাম অত্যাচার, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নৃশংসতার কথা।
দু-একদিনের মধ্যে কারফিউ শিথিল হলে আমি বুড়িগঙ্গা পার হয়ে বিক্রমপুরের মধ্যদিয়ে পায়ে হেঁটে সোজা রওনা দিলাম ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানায় আমার গ্রাম কালামৃধায়। সারা পথে সন্ত্রস্ত ছিলাম। বাসা থেকে সদরঘাট যাওয়ার পথে দেখলাম হায়েনাদের নৃশংসতার চিত্র মুছে ফেলা সম্ভব হচ্ছিল না। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমার বন্ধু সতীর্থ শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা শুনে মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। এছাড়া সাংস্কৃতিক সংগঠক কামাল লোহানীর কণ্ঠে খবর পাঠ শুনে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করে ফেলি। তখন ভাঙ্গা থানা থেকে পাক আর্মিরা স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় আমাদের বাজার-হাটসহ অন্যান্য বাজারে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ শুরু করে দিয়েছে। প্রতি রাতে আমরা তরুণরা এখানে-ওখানে পালিয়ে থাকতাম। সেসব আতঙ্কময় সময় ছিল দুঃস্বপ্নে ভরা। হিন্দু প্রধান এলাকা থাকায় তাদের আশ্রয় দেওয়া, নিরাপদ স্থানে কাউকে পৌঁছে দেওয়া, তাদের অভয় দেওয়া, জানমালের হেফাজত করা ছিল আমাদের তরুণদের পবিত্র দায়িত্ব।
এছাড়া স্থানীয় তরুণদের সমম্বয়ে রাজাকারদের বিরুদ্ধে কিছু কিছু গেরিলা প্রতিরোধ শুরু করি। আস্তে আস্তে এলাকায় থাকা নিরাপদ মনে না করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শরিক হওয়ার জন্যে ছুটলাম ফরিদপুর থেকে যশোরের ভেতর দিয়ে দুর্গম পথ মাড়িয়ে, পায়ে হেঁটে, কোথাও নৌকায়, রাতের আঁধারে চুপিচুপি, কত বিপদ মাথায় নিয়ে ওপার বাংলার উদ্দেশ্যে। মধুমতী পার হয়ে ইতনা, লোহাগড়া হয়ে বনগাঁ দিয়ে কলকাতায় পৌঁছাই। তখন কলকাতার কাঁকরগাছিতে আমাদের এলাকার অনেক ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা ছিল। প্রথমে ওদের ওখানে আশ্রয় নিই, তারপর আমরা কয়েকজন কল্যাণী মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং সেন্টার যাই ওবায়দুর রহমান, এম এ রেজাসহ অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। আমরা ওখানে অনেক দিন ক্যাম্পে কাটাই। কিছু প্রাথমিক ট্রেনিংয়ের কাজও চলতে থাকে। নিয়মিত দেশ থেকে লোকজন আসা-যাওয়া করছে, দেশের খোঁজ-খবরও পাই।
সেই মুহূর্তে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম আর আখতার মুকুল ভাইয়ের চরমপত্র পাঠ, আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ-এর দেশাত্মবোধক গান, বিশেষ করে অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ স্বরধ্বনি’ গানটি জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষভাবে আলোড়িত করে। যা হোক, তারপর সেই আগের বর্ণিত পথ ধরে কলকাতা গেলাম। কাঁকরগাছি সেই ভাইদের ওখানে গিয়ে উঠি, তাদের সেই ঋণের কথা আমি কোনো দিন ভুলব না। এর মধ্যে বেবাগানে মেনন ভাই, রনো ভাই, মহিউদ্দিন ভাই সব নেতার সঙ্গে দেখা হয়। এরপর বালিগঞ্জের ফাঁড়ির কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সন্ধান মিলল। দেখা হলো শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানীর সঙ্গে। তিনিই স্বাধীন বাংলায় অংশ নেওয়ার সব ব্যবস্থা করে দিলেন। স্বাধীন বাংলার প্রথম গান রেকর্ডিংয়ের সেই ভালো লাগা অনুভূতির কথা কখনো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।