আয়ারল‍্যান্ড বইমেলাঃ গর্ব ও অহংকারের এক অনন্য মঞ্চ

সাজেদুল চৌধুরী রুবেল: মিষ্টির সেরা যেমন রসগোল্লা তেমনি আমার কাছে মেলার সেরা হচ্ছে বইমেলা। আমাদের হরেক রকমের মেলা থাকলেও বইমেলার মতো কোনো মেলাই আমাকে টানেনা। এ মেলার প্রতি রয়েছে আমার অন‍্যরকমের দরদ, অন্য রকমের ভালোবাসা। কলেজ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালীন সময়েই এই মেলার প্রতি একটা প্রেম প্রেম ভাব হয়। সেই প্রেমের টানে ছুটে যেতাম ঢাকার সেই বইমেলায়। বইয়ের দোকান ঘুরে ঘুরে শত টানাপোড়েনের মধ্যেও বই কেনা ছিলো আমার একটা শখ বা নেশা। গুণী লেখকদের অটোগ্রাফসহ একটি বই কিনতে পারার মজাই ছিলো আলাদা। সময়ের পরিক্রমায় এখন ওই ধাপ পেরিয়ে নিজেই অটোগ্রাফ দিয়ে নিজের বই বিতরণ করি, বিক্রি করি বিভিন্ন জনের কাছে। অটোগ্রাফসহ বইকেনার যেমন এক ধরনের মজা আছে তেমনি অটোগ্রাফসহ বই বিলিয়ে বেড়ানোর মধ‍্যেও রয়েছে এক অন‍্য রকমের সুখ, এক অন‍্য রকমের আত্মপ্রসাদ। এ সুখ আর আত্মপ্রসাদের মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে বিগত কয়েক বছর যাবত আয়ারল‍্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়া অমর একুশে বইমেলা।

হাঁটি হাঁটি পা করে এগিয়ে চলেছে আয়ারল‍্যান্ডের বইমেলাটি। আগামী ২৯ জুন ২০২৫ চতুর্থ বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা, আয়ারল‍্যান্ড। এর যাত্রা শুরু হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব‍্যক্তিত্ব, সুপরিচিত, একাধিক বিশেষণের অধিকারী মানুষ সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমানের হাত ধরে। তিনি এ মেলার প্রাণপুরুষ বা প্রধান সংগঠক এ কথা যেমন সত্যি তেমনি এ মেলার গলায় সাফল্যের মালা পরানো যে তার একার পক্ষে সম্ভব নয় সে কথাও সমানভাবে সত্যি। এ মেলাকে প্রতিবছর সফলভাবে আয়োজন ও উদযাপিত করার পেছনে রয়েছে একদল চৌকস নিবেদিত প্রাণ। এরা কোনো নামধামের চিন্তা করেনা, নেতৃত্বের ধার ধারে না। অন্ধকার চিরে সমাজে আলোর কুসুম ছড়িয়ে দেয়াই যেনো এদের একমাত্র উদ্দেশ্য। আমি নিশ্চিত এমন একটি দলের দরদি মন ও ভালোবাসায়, কর্মস্পৃহা ও হাতের ছোঁয়ায় এবারের বইমেলাটিও হয়ে ওঠবে আরও বেশি অনবদ্য, শিল্পিত ও উপভোগ্য।

বিগত লেখাগুলোতে আমি উল্লেখ করেছিলাম এ বইমেলা একদিন মহীরুহে পরিণত হবে, ইউরোপের রোল মডেলে পরিণত হবে আবার কখনো বা বলেছি এটি আমাদের শেকড়ের সন্ধান দিয়ে আমাদের ভালোবাসা, আবেগ ও অনুভূতির জায়গা হয়ে দাঁড়াবে। এও বলেছি, মূলধারার এ বইমেলা গর্ব ও গৌরবের অহংকার নিয়ে একদিন আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠার গান গাইবে। আজ এ কথার সত্যতা মেলে যখন দেখতে পাই সুমাইয়া তানজিনের মতো কোনো প্রিয় বোন এভাবে লিখে, “আমরা যারা বাঙালি আয়ারল্যান্ডে বসবাস করছি অমর একুশে বইমেলা আমাদের জন্য একটি গর্বের বিষয়। এই গর্ব বুকে ধারণ করেই আবারো উদযাপিত হতে যাচ্ছে চতুর্থ অমর একুশে বইমেলা।

আমরা এর অংশ হতে আবারো আসছি মেলায়। আপনারাও আসুন।” একজন ক্ষুদে লেখক হিসেবে আমার আত্মতৃপ্তি এইখানেই যে, বইমেলা সম্পর্কে আমি যে ভবিষ্যদ্বাণী ইতিমধ্যে করেছিলাম তা ক্রমান্বয়ে সত্য হতে চলেছে।

এবারের বইমেলাটি আরও ব‍্যপক পরিসরে ও জাঁকজমকের সাথে সম্পন্ন হবে বলে আমার বিশ্বাস। ইতোমধ্যে মেলায় পনেরোটি বইয়ের স্টল বরাদ্দ হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ওইসব স্টলে থাকবে শিশুতোষ বই, উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদি। এর মাধ্যমে সকল ধরনের পাঠক তাদের পছন্দের বই খুঁজে নিতে পারবে। এ ছাড়াও মেলায় থাকবে কিছু খাবারের স্টল, জুয়েলারি বা কাপড়-চোপড়ের দোকান যা মানুষের মনে ভিন্ন আমেজের সৃষ্টি করবে। একটি কথা বলতেই হয়, মেলার পরিসর যতো বেশি বৃদ্ধি পাবে এর প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতার মাত্রাও ততোবেশি বৃদ্ধি পাবে। তাই আয়োজক কমিটিকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার পাশাপাশি তাদের ভেতরে সচেতনতা, সহনশীলতা ও উদারতান্ত্রিকতার চাষ অব্যাহত রাখতে হবে।

সময়জ্ঞান বলতে একটি কথা আছে। যে কোনো কাজই সময়োপযোগী সময়েই করতে হয়। আয়ারল‍্যান্ডে সর্বপ্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। পরবর্তীতে গোটা পৃথিবী কভিডে আক্রান্ত হওয়ায় সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। ২০২২ সালে যখন আমরা পৃথিবীর স্বাভাবিক চেহারা ফিরে পাই তখন বইমেলার আয়োজক কমিটি আবারও উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন মেলা সম্পাদনের জন্য। তাদের অদম্য প্রচেষ্টায় মেলা অনুষ্ঠিত হয় তবে তা ফেব্রুয়ারিতে নয়, মে-তে। আইরিশ আবহাওয়া ও লম্বা দিনের কথা বিবেচনায় এনেই আয়োজকবৃন্দ মে/জুন বা সামারে (Summer) মেলা উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির সাথে বইমেলার যেহেতু নাড়ির সম্পর্ক তাই ফেব্রুয়ারিতেই বইমেলা অধিকতর শোভনীয়। সে ভাবনা থেকেই বিষয়টি আমি সাংবাদিক সৈয়দ জুয়েলসহ দু’ একজনের সঙ্গে শেয়ার করি। তারই ফলশ্রুতিতে সম্প্রতি এক মিটিংএ সৈয়দ জুয়েল বিষয়টি উত্থাপন করলে প্রধান সংগঠকসহ সকল সম্মানিত সদস্যবৃন্দ ঐক‍্যমত পোষণ করেন। আমি তাদের এ ঐক্যমতকে শ্রদ্ধা জানাই ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি এবং আশা করছি আমাদের প্রধান সংগঠক জনাব সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান এবারের বইমেলায় এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানিয়ে একটি পরিষ্কার ঘোষণা প্রদান করবেন।

আয়োজক কমিটির বাইরেও আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই সকল কবি-সাহিত্যিকবৃন্দকে যারা মেলায় স্টল বরাদ্দ করে মেলাটির শোভা বর্ধন করেন এবং আগত সকল অতিথিদেরকে যাদের সরব উপস্থিতিতে মেলাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে । ধন্যবাদ ও বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় সময় টিভির সাংবাদিক জনাব সৈয়দ জুয়েলকে যিনি আয়ারল‍্যান্ডের বইমেলাতো বটেই বাঙালি কমিউনিটির সকল প্রকার সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে আয়ারল‍্যান্ডস্থ বাঙালি কমিউনিটিকে সফল ভাবে বাংলাদেশে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়াও জাহিদ মমিন চৌধুরী, মাহিদুল ইসলাম সবুজসহ স্থানীয় ভাবে বিশেষ করে ডাবলিন বাংলাবার্তা, বাংলাটাইমস, তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাগুলো যেভাবে বইমেলাকে ধারণ করে এর প্রচার ও প্রসারে বিগত দিনে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছেন সেজন্য তাদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি জানাতে হয় সাধুবাদ।

আমাদের এ বইমেলাটি কেবল বই কেনা-বেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা বরং এটি রূপান্তরিত হয় বাঙালির এক মিলনস্থলে। এখানে পরিবেশিত হওয়া গান, আবৃত্তি, কবি-লেখকদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময়, সারাদিন ব‍্যপী চলতে থাকা জমশেদ আড্ডা প্রভৃতি বিষয় গুলোর কারণে বইমেলাটির গ্রহণযোগ্যতা বছর বছর বেড়েই চলছে এবং মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠছে। প্রকৃতঅর্থে যারা বই ভালোবাসেন তাদের জন্য বইমেলা নিঃসন্দেহে এক আনন্দ ও অভিজ্ঞতার স্থান। তাই জীবনকে অভিজ্ঞতালব্ধ, আনন্দময়, পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধকরণের স্বার্থে এবং প্রবাসে নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ, উৎসাহিত ও পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে প্রতিটি বাঙালিরই সপরিবারে এ মেলায় অংশগ্রহণ অত‍্যাবশ‍্যক। তাই সকল বন্ধুদের আমার আহ্বান ও অনুরোধ, ২৯ জুন ২০২৫ ডিসিইউতে (ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি) উপস্থিত হয়ে মেলাটিকে স্বার্থক ও সফল করে তুলুন। সফলতার ক্ষেত্রে বাঙালির এ প্রয়াস ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আমি আবারও বলছি, এ মেলাই হবে একদিন আমাদের ভালোবাসা, আবেগ-অনুভূতির এক অনবদ্য ক্ষেত্র, গর্ব ও গৌরবের এক অনন্য মঞ্চ এবং অহংকারের এক মূর্ত প্রতীক।

লিমরিক

২৪ জুন ২০২৫

লেখক- কবি ও প্রাবন্ধিক

SHARE THIS ARTICLE