আল-জাজিরায় বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন ও সরকারের প্রতিবাদ

 


আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ “অল দা প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান” নামে আল-জাজিরায় একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই নেতিবাচক প্রতিবেদন আল জাজিরা আন্তর্জাতিক সংবাদেও প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে মূলতঃ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ ও তার পরিবারের অপরাধ সংক্রান্ত সম্পৃক্ততা তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে এক ঘণ্টা বিশ সেকেন্ডের ভিডিও প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ায় সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অগ্রসরমান ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আয়ারল্যান্ডেও এই প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা চলছে।

প্রতিবেদনে, সেনাবিহিনী প্রধান জেনারেল আজিজের চার ভাই হারিস আহমেদ, আনিস আহমেদ, জোসেফ আহমেদ ও টিপু আহমেদের অপরাধ জগতের সাথে সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে, সেই ভাইদের সাথে জেনারেল আজিজের ধারাবাহিক যোগাযোগের ভিডিও প্রকাশিত হয়, এমনকি এই পরিবার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নমনীয় মনোভাবের কথাও প্রধানমন্ত্রীর বয়ানে তুলে ধরা হয়।

জেনারেল আজিজের এই চার ভাই বাংলাদেশে অপরাধ এবং হত্যা জগতের সম্পৃক্ততা থেকে টিপু আহমেদের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু, এক ভাই জোসেফ আহমেদের আইনি প্রক্রিয়ার মৃত্যদন্ড প্রাপ্তি এবং অন্য দুই ভাইয়ের পালিয়ে বিদেশে থাকার ভিডিও চিত্র দেখানো হয়। জোসেফ আহমেদ প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতায় ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছেন।


প্রতিবেদনে দেখা যায়, যাবজ্জিবন সাজাপ্রাপ্ত ভাই হারিস আহমেদের বর্তমান আবাস কুয়ালালামপুরে সেনাবাহিনী প্রধানের অব্যাহত যোগাযোগ আছে। অন্য পলাতক ভাই হারিস আহমেদকে জেনারেল আজিজের তত্ত্বাবধানে হাঙ্গেরিতে ব্যাবসার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। তদন্তে দেখানো হয়েছে, কিভাবে এখনো পলাতক শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী ভাইদের সাথে দেশের সেনাবাহিনী প্রধান যোগাযোগ রাখছেন এবং অব্যাহত সহযোগিতা প্রদান করছেন।  

দু’বছর ব্যাপী পরিচালিত এই তদন্তের সময়, আল জাজিরার তদন্তকারী ইউনিট ১৯৯৬ সালে ঢাকায় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মি মুস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা হত্যার সাথে জড়িত থাকার জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়া হারিস ও আনিস আহমেদকে সনাক্ত করে। এই হত্যার পরে হারিস ও আনিস দু’জনই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে যায়। হারিস আহমেদ, যিনি এখনও দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের তালিকায় রয়েছেন, তিনি হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে পালিয়ে এসে মোহাম্মদ হাসানের পরিচয় ব্যবহার করে বসবাস করছেন। দ্বিতীয় ভাই আনিস আহমেদ ২০০৭ সালে হত্যাকাণ্ডের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে পালিয়ে যান, সেই আনিসকে আল জাজিরা কুয়ালালামপুরে বাস করছেন বলে প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ আইনে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী ভাইদের সাথে জেনারেল আজিজ যোগাযোগ রাখেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে, জেনারেল আজিজের ছেলের বিয়েতে হারিস এবং আনিস ঢাকা সফর করেন, এবং সেখানে এই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং বিদেশী অতিথিদের সাথে যুক্ত থাকেন। এছাড়াও পরিচয় গোপন করে মিথ্যা নামের সকল দলিল তৈরিতে জেনারেলের মদদের কথা এই প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, জেনারেল আজিজের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে, “এমনকি প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) বলেছেন:‘ হারিস যদি কিছু করতে চায় তবে তাকে তা করতে দিন। আমরা সাহায্য করব।”

আরও বলেছেন, “দেখুন, তাঁর ভাইরা কারা আমার চেয়ে ভাল জানেন না। আপনারা কোথায় ছিলেন… যখন আমার বাড়িতে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছিল? এই জিনিসগুলি আমার বাড়িতে ঘটছিল। আপনি কোথায় ছিলেন? এই চিফের ভাইয়েরা (জেনারেল আজিজ আহমেদ) আমার চারপাশে ছিলেন। তারা আমার মূল ভিত্তি ছিল। “

এদিকে, গোপন রেকর্ডিংয়ের একটি ধারাবাহিকতায় হারিস প্রকাশ করেছেন যে, র‍্যাব এবং পুলিশ বাহিনীর সাথে তার ব্যাবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং উভয় পক্ষই ব্যাবসায়িক সুবিধা অর্জন করে থাকেন।

প্রতিবাদঃ ইতিমধ্যে আই এস পি আর এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মনে হয়েছে শুধুমাত্র দায়মুক্তির জন্য এই প্রতিবাদ, এর থেকে ভালো কোন প্রতিবাদ অবশ্য করা যায় বলেও মনে হয়না, কেননা এই প্রতিবেদন প্রমাণের জন্য কোন বড় ধরনের ইনভেস্টিগেশনের প্রয়োজন কি আদৌ আছে? 

প্রতিবেদনটির শক্তিঃ প্রতিবেদনটির মূল শক্তি হচ্ছে জেনারেল আজিজের পরিবারের অপরাধ সম্পৃক্ততা। শাস্তিপ্রাপ্ত পলাতক আসামী পরিবার থেকে একজন ব্যাক্তিকে জেনারেল পদমর্য্যাদা দিয়ে সেনাবিহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার যৌক্তিকতা কি সেটাই মূল প্রশ্ন? তাহলে কি ধরে নিতে হবে এর চেয়ে ভালো কোন জেনারেল এই কাজের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না? কিংবা এখনো দেশে তার সমকক্ষ কোন সামরিক কর্মকর্তা তৈরি হন নি? সরকারের এই দুর্বলতাই হচ্ছে এই প্রতিবেদনের মূল শক্তি। জেনারেল আজিজের বক্তব্যে এই কথাই উঠে এসেছে যে, তার ভাইদের ঋণ পরিশোধের প্রয়োজনে তাকে পদায়ন করা থেকে তার ভাইদের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন এই অপরাধী চক্রের ঋণের সাথে তার আবেগ জড়িয়ে তার পরিচ্ছন্ন ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্থ করছেন সেটা বুঝা দায়। এটাও অনেকে ভাবছেন, শুধু ঋণ পরিশোধ নয় জেনারেল আজিজের হয়তবা আরও কোন গোপন শক্তি আছে।

প্রতিবেদনের দুর্বলতাঃ প্রতিবেদনের সাথে সম্পৃক্ত যেমন, ডেভিড বার্গম্যান, জুলকারনাইন সায়ের খান (সামি) এবং তাসনিম খলিল নেত্র নিউজ-এর প্রধান সম্পাদক । ডেভিড বার্গম্যান ব্রিটিশ সাংবাদিক হলেও তিনি বাংলাদেশের জামাতা, তার সরকার বিরোধিতা প্রকাশ্য, অতীতে তিনি সাজাপ্রাপ্তও হয়েছেন। সামি নামে যিনি এই প্রতিবেদনে এসেছেন তিনি একজন কেডেট ছিলেন বলে জানা গিয়েছে এবং উঠে এসেছে যে তাকে সামরিক একাডেমী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল আর তাসনিম খলিল নেত্র নিউজ থেকে সরকার বিরোধী সংবাদ প্রতিবেদন করছেন। এই প্রতিবেদনে বোঝা যায় যারা এই সরকার থেকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে প্রবাসে পাড়ি দিয়েছেন তারা সরকারকে দুর্বল করতেই এই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।

তবে, এই প্রতিবেদনে নূতন কিছুই উঠে আসেনি। জেনারেল আজিজের পারিবারিক কালো দিক সরকার যেমন জানে, দেশের মানুষও জানে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কিংবা তার মন্ত্রীসভা সদস্যদের প্রত্যক্ষ কোন সম্পৃক্ততা এই প্রতিবেদনে দেখাতে পারেনি। জেনারেল আজিজ কি বলছেন সেটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য তেমন কোন মূল্য বহন করেনা। তাছাড়া যে সকল ছবি, দলিল এবং ভিডিও ফুটেজ সম্পাদিত করে নিজেদের যেখানে ইচ্ছা যুক্ত করেছেন সেটা দিয়ে তাদের প্রতিবেদন দুর্বল হয়েছে, শক্তিশালী হয়নি। জেনারেল আজিজ কোট খুলে প্লেনে রাখছেন কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে উঠছেন কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তি ইতিহাসের ভিডিও এই প্রতিবেদনের জন্য কি গুরুত্ব বহন করেছে জানা নেই। আর হারিস আহমেদ মুখে বলছেন র‍্যাব কিংবা পুলিশ বাহিনী তার নিজস্ব গুণ্ডা বাহিনী, এগুলো বললেই প্রমাণিত হয়ে যায়না। 

এটা সকলেই জানেন যে, কাতারভিত্তিক আল জাজিরা ইরান, তুরস্ক বলয়ের অভ্যন্তরে থেকে ইসরায়েল, সৌদি আরব বিরোধীতায় আসক্ত। আল জাজিরার জন্য এই প্রতিবেদন তাদের অন্ধ ইসরায়েল বিরোধিতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তবে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম হিসেবে এই প্রতিবেদন মোটেও মানসম্পন্ন হয়নি বরং বর্তমান সরকার বিরোধী বলয়ে তাদের সম্পৃক্ততা আবারো প্রকাশিত হয়েছে।

আমাদের মন্তব্যঃ প্রতিবেনটি সারা জাতির জন্য একটি অসম্মান বয়ে এনেছে। এই নেতিবাচক প্রতিবেদন একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হওয়ায় বাংলাদেশের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে ঠিক তবে সেটা নেতিবাচক ভিত্তির উপর। সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইরা যদি শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী না হতেন তাহলে কি আল জাজিরা এই সংবাদ পরিবেশন করতে পারত? সেবাহিনী প্রধান যদি এমন হতেন যে তার চার ভাইরাও বাংলাদেশের ইতিবাচক অগ্রযাত্রার সহগামী তাহলে দেশ এবং জাতির সম্মান বর্ধিত হতে পারত। যদি, তার ভাইরা অপরাধী না হতেন তাহলে আল জাজিরা আজ বিশ্বের সংবাদ জগতে আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে পারত। 

SHARE THIS ARTICLE