
আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই হঠাৎ করে ইউক্রেনে হামলা শুরু করেন পুতিন। শুরুতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেও কিছুটা ধকল সয়ে নতুন ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে ইউক্রেন। রাতারাতি পরিস্থিতির এমন ব্যাপক উন্নতির পেছনে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের কার্যকর অস্ত্র হিসেবে যেটি কাজ করেছে সেটি হলো তার টেলিফোন।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরুদ্ধ কিয়েভে নিজের দফতরে বসে টেলিফোনের মাধ্যমেই পশ্চিমাদের ভূমিকা বদল করতে রাজি করান জেলেনস্কি। কয়েক ঘণ্টা আগেও যা অকল্পনীয় ছিল। পশ্চিমাদের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে রাশিয়া। দমে না গেলেও এসব নিষেধাজ্ঞা যে রাশিয়ার জন্য ব্যাপক খারাপ পরিণতি বয়ে আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রেখে চলেছেন জেলেনস্কি। টেলিফোনে একের পর এক রিং করে চলেছেন তিনি। তার এই টেলিফোন অস্ত্র যে পারমাণবিক বোমার মতোই কাজ করেছে তারই প্রমাণ পশ্চিমাদের একচেটিয়া নিষেধাজ্ঞা।
রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা চালায় তখন অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েন জেলেনস্কি। একের পর এক ফোন করেন মিত্রদের। টুইটে সেসবের বিষয়ে আক্ষেপও করতে দেখা যায় তাকে। একদিকে টেলিফোনে ব্যস্ত, অন্যদিকে মিত্ররা তাকে একা করে দিচ্ছেন প্রকাশ্যে এমন আফসোসও করেছেন দেশটির জনপ্রিয় এই প্রেসিডেন্ট। জেলেনস্কির এই বারংবার চেষ্টাই তাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
একান্ত চেষ্টায় ও টেলিফোন অস্ত্রে ইউরোপকে একাট্টা করে ফেলেছেন জেলেনস্কি। এই পরিবর্তনকে তার বিশাল অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপীয় এক নেতার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা তাকে বিস্ময়ের চোখে দেখছি। তিনি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে বাঁচাতে বা রাশিয়াকে পরিবর্তন করতে হয়তো পারবেন না। তবে তিনি ইউরোপকে পরিবর্তন করছেন।’
জেলেনস্কি তার কার্যালয়ে বসে কী পরিমাণ টেলিফোনালাপ করছেন তার একটি হিসাব তুলে ধরেছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান। সেখানে বলা হয়েছে, শনিবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরোঁর সঙ্গে কথা বলার মধ্যে দিয়ে দিন শুরু করেন জেলেনস্কি। এরপর একে একে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন, ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘি, সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ইগনাজিও ক্যাসিস, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ, চেজ রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী পেট্র ফিয়ালা, পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেজ দুদার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। সবশেষ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে কথা বলে টেলিফোনালাপ শেষ করেন।
এর আগের দিনও জেলেনস্কির টেলিফোন কলের পরিমাণ ছিল একই রকম। তিনি তার এসব আলাপে অস্ত্র সহযোগিতা, রাশিয়াকে হামলা বন্ধ করতে বলা এবং সর্বপরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য অনুরোধ করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একদিকে যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের নির্দেশনা দিয়ে ও একের পর এক টেলিফোনালাপ করে জেলেনস্কি দারুণভাবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব টেলিফোন কলই তাকে বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
বেশিরভাগ যুদ্ধে সামাজিক পরিবর্তনের গতি দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। ইউক্রেন পরিস্থিতির যেভাবে পরিবর্তন হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমনটি বিশ্বে আর ঘটতে দেখা যায়নি।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে জার্মানি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে ইউক্রেনকে অস্ত্র পাঠিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশতে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একইভাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘি ইতালিকে রাশিয়ান গ্যাস থেকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। পশ্চিমারা সুইফট থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। এছাড়াও একসঙ্গে পশ্চিমাদের এমন সিদ্ধান্ত দৃষ্টান্তমূলক।
তবে বিশ্লেষকরা এ-ও বলছেন যে, শুধু জেলেনস্কির লবিংয়ের কারণেই এমনটি ঘটেছে তা নয়। এটি পশ্চিমাদের রাশিয়াকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে একত্রিত অভিযান।
গার্ডিয়ানের কাছে এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়ার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় বাহিনীর দীর্ঘসময় যুদ্ধ করে টিকে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। তবে পশ্চিমাদের লক্ষ্য রাশিয়াকে তথা পুতিনকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এতটাই পঙ্গু করে দেওয়া, যাতে তিনি তার শর্তে জিততে না পারেন।