
আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ সরকারের পদত্যাগ ও সংসদের বিলুপ্তি চেয়ে ‘এক দফা’ ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এ ‘এক দফা’ সামনে রেখেই আগামীতে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে ১৮ ও ১৯ জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিও জানিয়েছে দলটি। দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
বক্তব্যের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকের ঘোষণা আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হিসেবে দিচ্ছি না, এ ঘোষণা নির্বাসিত নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক দলগুলো যুগপৎভাবে অবৈধ সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করতে ঘোষণা করব। এ ঘোষণা ঐতিহাসিক। জাতিকে মুক্ত করার আহ্বান। জাতিকে তার হারানো অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার অধিকার।’ সমাবেশে তিনি স্মরণ করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। শ্রদ্ধা জানান বিএনপির নিহত কর্মীদের প্রতি। তাদের নাম উল্লেখ করেও শ্রদ্ধা জানান মির্জা ফখরুল।
কর্মসূচি ঘোষণার আগে তিনি বলেন, ‘এ সংগ্রাম অস্তিত্বের সংগ্রাম। এ সংগ্রাম ১৮ কোটি মানুষের সংগ্রাম। ভোট দিতে চাই। যাকে খুশি তাকে দেব। সমস্ত রাজনৈতিক দল যারা যৌথভাবে আন্দোলন করছি, সর্বসম্মতভাবে আমরা যৌথ ঘোষণা দেব যার যার জায়গা থেকে। ৩৪টির মতো দল ও জোট সিদ্ধান্ত নিয়েছি সর্বসম্মতভাবে। আসুন, দুর্ভেদ্য উত্তাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লুটেরা ফ্যাসিবাদী সরকার সরিয়ে সত্যিকার অর্থে জনগণের রাষ্ট্র নির্মাণ করি।’
কর্মসূচি ঘোষণার পর মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এ কর্মসূচি ঘোষণা দিলাম। ওইদিন কর্মসূচি করার আগেই দাবি মেনে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে দেবেন, পদত্যাগ করে বিদায় নেবেন। যদি বিদায় না নেন তারপর তো আরো কর্মসূচি আসছেই। কঠোর কর্মসূচি দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবে জনগণ। আজকের এ এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা ব্যক্তি মির্জা ফখরুলের নয়।
তরুণ প্রজন্মের তারুণ্যের নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা। দেশের ১৮ কোটি মানুষ যারা গণতন্ত্রের জন্য তাকিয়ে আছে, তাদের জন্য ঘোষণা।’
কর্মসূচি উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব জানান, এক দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১৮ জুলাই ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে মহানগরী ও জেলা পর্যায়ে পদযাত্রা; ঢাকা মহানগরীতে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা (গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী) এবং ১৯ জুলাই ঢাকা মহানগরীতে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা (উত্তরার আব্দুল্লাহপুর থেকে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক) পর্যন্ত পদযাত্রা। এ কর্মসূচিকে একেবারেই শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা বলেও উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল।
সমাবেশে আসা মানুষদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘এ আওয়ামী লীগ সরকার বলেছিল, ঘরে ঘরে চাকরি দেবে, ১০ টাকা সের চাল খাওয়াবে। কিন্তু তাদের কথার সঙ্গে সেটার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এরা আবার বলেছিল, কৃষকদের বিনামূল্যে সার দেবে। এখন সারের দাম তিন-চার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার সারও পান না কৃষক।’
খালেদা জিয়ার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে এ সরকার জীর্ণশীর্ণ কারাগারে রেখেছিল। তাকে ভালো চিকিৎসা পর্যন্ত দেয়নি। আমরা বারবার তার চিকিৎসা বাইরের দেশে করানোর জন্য বলেছিলাম। পরিবার থেকেও বলা হয়েছিল। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয়নি। এজন্য তাকে বারবার হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। কোর্টকে ব্যবহার করে এ সরকার ক্ষমতায় থাকতে চায়। তারা মামলা দিয়ে মাসের পর মাস জেলে আটকে রাখে, জামিন দেয় না। যেটা মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাস্থল, সেখানে এখন বিচার পাওয়া যায় না। এখন আর কথা বলার সময় নেই। এখন আমাদের একটাই কাজ—এ ভয়াবহ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে নেমে আসা।’
আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্দেশ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘হামলা করবেন, মামলা করবেন, মিথ্যা ফরমায়েশি রায় দিয়ে সাজা দেবেন, এটা হতে দেব না। অনেক সুযোগ দিয়েছি। আর সুযোগ পাবেন না। অনেক ডলার পাচার করেছেন। গত ১৫ বছরে অনেককে জেলে ঢুকিয়েছেন, সাজা দিয়েছেন, তাতে কোনো লাভ হয়েছে? বিএনপি কখনো পিছু হটে না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে যেতে হবে, তবে তিনি কোন দেশে যাবেন, তা তিনি জানেন না। এখন আপনাদের গায়ে একটা আঘাত এলে পাল্টা দুটা আঘাত করবেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. মঈন আলী খান বলেন, ‘এ সরকার দেশের সুশাসন নষ্ট করে কুশাসন সৃষ্টি করেছে। এ সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করে জুলুমের শাসন কায়েম করেছে। তারা গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল কায়েম করেছে। এ সরকার ভোটাধিকার হত্যা করে দিনের ভোট রাতে করেছে। এরা দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে।’
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আজকে যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, এ ঘোষণা আগামী দিনে এ সরকারের পতন ঘটাবে ইনশাআল্লাহ। জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জাতি আজ মুক্তির ঘোষণা চায়। বাংলাদেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ সরকারকে বিদায় করার জন্য। জনগণ জেগে উঠেছে। তাই ওই সংবিধানের দোহাই দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, বাকস্বাধীনতা হরণকারী কারো রেহাই মিলবে না। এবার যেতে হবে।’
সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু দাবি করেন, তাদের আজকের সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। বিএনপির চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচি শুরুর পর থেকে ১৭ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এজন্য আপনাদের বিচার হবে।’
আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে লুটপাটের রাজত্ব বানিয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। তিনি বলেন, ‘এ সরকারকে আর ক্ষমতায় রাখা যায় না। আপনি নিজে ঠিক করবেন, নাকি আমরা ঠিক করে দেব; আপনাকে যেতেই হবে। এরশাদ থাকতে পারেননি, আপনিও থাকতে পারবেন না।’
এদিকে সকাল থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর ১২টার মধ্যেই বিএনপি নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল।