
এ,কে,আজাদ, আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়।ভালোবাসা। ছোট্ট কয়েকটি শব্দের নাম। কিন্তু এ কয়েকটি শব্দে লুকিয়ে আছে হাজারো সুখ। সুখের বিন্দু বিন্দু কণা। কখনো কখনো দুঃখেরা ভেসে আসে মনের আনাচে-কানাচে। নামহীন শত কষ্টেরা বাসা বাঁধে মনের কোণে। তখন হৃদ মাঝার থেকে দুঃখ এবং কষ্টগুলো একমাত্র দূর হয় কারো ভালোবাসা দ্বারা। ভালোবাসার মানুষ ছাড়া এই পৃথিবীতে সুখী হওয়া যায় না। ভালোবাসার বন্ধন ছাড়া এই পৃথিবীটা লাগে খুবই নিঃসঙ্গ। একাকী। বিষন্নতায় কাটে সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা। প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনেই কিন্তু কোনো না কোনো সময় ভালোবাসা এসে উঁকি দেয়। প্রেম ভালোবাসায় পড়েনি এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনার মতো।
কেউ ভালোবাসাবাসিতে জীবনকে উদ্ভাসিত করে তুলছে, কেউবা জীবনের নেহায়েত টানাপোড়নে পড়ে হয়তো তাদের মনে ভালোবাসা বাসা বাঁধতে পারেনি। প্রেম ভালোবাসায় যেমন একরাশ সুখ-শান্তি বিরাজ করে, তেমনি প্রেম-ভালোবাসায় জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত অনিবার্য। ভালোবাসা হচ্ছে হঠাৎ বা ধীরে ধীরে ঘটে যাওয়া এক সম্পর্কের আবর্তের নাম। হঠাৎ আসুক আর ধীরে আসুক, ভালোবাসা কিন্তু কারও জীবনে বলে কয়ে আসে না। কারও জীবনে হঠাৎ করে আসে আবার কারও জীবনে ধীরে ধীরে ঘটে। সোজা কথা, একের প্রতি অন্যের প্রচণ্ড এক মানসিক আসক্তির নাম ভালোবাসা। জীবন আর ভালোবাসা একে অপরের পরিপূরক। এক জীবনের সাথে অন্য জীবনের পরিপূর্ণতার জন্যই কিন্তু ভালোবাসার প্রয়োজন।
জীবনের পূর্ণতা দেওয়ার জন্য মানুষ যে বন্ধন তৈরী করে তার নাম— ‘ভালোবাসার বন্ধন।’ তবে এই ভালোবাসার বন্ধনটা তৈরী হয় দুইভাবে।
১. অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে।
২. বিয়ে করে পবিত্র বন্ধন তৈরী করার মাধ্যমে।
কেউ পূর্ণিমা রাতে প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে আকাশের নীলিমা দেখে রবের শুকরিয়া আদায় করে। আবার কেউবা হোটেলের নাপাক বিছানাতে পরনারীর সাথে যিনায় লিপ্ত হয়। এগুলো সবই ভালোবাসার বন্ধন। দু’টোর মধ্যে পার্থক্য হলো একটি হালাল প্রেম, আর অপরটি হারাম প্রেম। হারাম রিলেশনকে শরীয়াহ কোনোকালে বৈধ করেনি এবং করবেও না। বরং অবৈধ প্রেম জীবনকে করে ফেলে দূর্বিসহ। চিন্তাযুক্ত। যেকোনো দিন যেকোনো মুহূর্তে বৈধ ক্ষেত্রে বৈধ উপায়ে ভালোবাসার প্রকাশ ইসলাম সমর্থন করে। আর অবৈধ ক্ষেত্রে ও অবৈধ উপায়ে ভালোবাসা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ।
যারা অবৈধ প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, প্রতিটি ক্ষণে তাদের উপর আল্লাহর অসন্তুষ্টি বর্ষণ হতে থাকে। পক্ষান্তরে যারা বিয়ে করে বৈধ পন্থায় প্রেম করে, প্রতিটি ক্ষণ তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রহমত ও বরকত নাযিল হতে থাকে। আমরা ভালোবাসার বন্ধন’-এর দু’টি দিক নিয়ে এই আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ। যারা হারাম এবং অবৈধ জড়িয়ে আছে তারা কীভাবে সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হবে, কী করে তাদের এই বন্ধনকে হালাল করা যাবে এইসব বিষয়ে আমরা আলোচনা করব। আর যারা এখানো হারাম রিলেশনে জড়িয়ে নিজেদেরকে কলঙ্কের কালি লাগায়নি, তারা কীভাবে বিয়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে, জীবনটাকে কীভাবে সুখময় করবে, সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করব।
জীবনটাকে উপেভোগ করুন হালাল পন্থায় দেখবেন জীবনটা কত সুখের! কত রোমান্সের। আপনি কল্পনা করতে পারবেন না বিয়ে জীবনটা এত আনন্দের। এত সুখের। যদি সামর্থ হয়ে থাকে, তাহলে খুব দ্রুত বিয়ে করুন। তৈরী করে ফেলুন জীবনের সেরা একটি বন্ধন— ‘ভালোবাসার বন্ধন। আপনার ইমান, দ্বীন সবই পূর্ণতায় আসবে। হারাম রিলেশন কিংবা অবৈধ পন্থায় জড়িয়ে নিজের এই সুঠাম জীবনকে বিনষ্ট করে দিবেন না। শরম আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অপেক্ষা না করে খুব ভালো এবং একজন দ্বীনদার পাত্রী/পাত্র দেখে জীবনটাকে তার হাতে সমর্পণ করুন। একজন আরেকজনকে বুঝুন। জান্নাতের পথে চলতে সাহায্য করুন। একজন অপরজনের জন্য হৃদয়ের আঁচল বিছিয়ে দিন। হয়ে যান দু’জন দু’জনার। তৈরী করুন এক সুখময় বন্ধন।
পরস্পরের মাঝে সুখ-দুঃখ শেয়ার করে পবিত্র এই বন্ধনটাকে ইতি টানুন জীবনের শেষ অবদি। তারপর না হয়, পরজনমে জান্নাতের নীল আসমানের নিচে একজনমের পবিত্র বন্ধনের টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো মনে করে দু’গাল হেসে নিয়েন।
ভ্যালেন্টাইন দিবসের ইতি কথা আপনাদের হয়তো অনেকেরই জানা নেই। ভালোবাসা দিবস ভিন্ন সংস্কৃতি ভালোবাসা উদযাপনের জন্য ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-এর উৎপত্তি খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের শাসনামলে। এ সময় ক্লডিয়াস একটি বিধান জারি করেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না, কারণ বিয়ে সৈনিকদের যুদ্ধক্ষেত্রের দৃঢ়তাকে ব্যাহত করে। এ সময় ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এ আইনের বিরুদ্ধাচরণ করেন এবং গোপনে সৈনিকদের বিয়ের কাজে সহযোগিতা করতে থাকেন। এর পরিণতিতে তাকে কারাবরণ করতে হয়। ভ্যালেন্টাইন কারারুদ্ধ হওয়ার পর প্রেমাস তরুণ-তরুণীদের অনেকেই প্রতিদিন তাকে কারাগারে দেখতে আসত এবং ফুল ও উপহার দিত। কারারক্ষীর এক মেয়েও ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেত।
একসময় ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীর মেয়ের প্রেমে পড়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ভ্যালেন্টাইনের বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি তার অন্তিম চিঠি ছিল। স্ত্রীর প্রতি ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা ও ভ্যালেন্টাইনের প্রতি দেশের তরুণ-তরুণীদের ভালোবাসার কথা চলে যায় সম্রাটের কানে। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে খ্রিস্টীয় ২৭০ শতকের ১৪ই ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ১৪ই ফেব্রুয়ারির এ দিনটিকে ওই পাদ্রির নামে নামকরণ করে ভালোবাসার উৎসব দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন। খ্রিস্টানদের একটি ধর্মীয় উৎসব কালক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে জৈবিক কামনা ও যৌনতার উৎসবে।
যদিও দিবসটি ছিল বিবাহিতদের অধিকার আদায়ের জন্য একটি প্রয়াস কিন্তু এখন অবিবাহিতরাই এ দিনটিকে ভালোবাসা প্রদর্শনীর উপলক্ষ বানিয়ে নিয়েছে। যাদের বিয়ের সামর্থ্য আছে তারা বিয়ে পরবর্তী ভালোবাসা গোপনে উদযাপন করতেই পারে। কিন্তু প্রকাশ্য অবাধ যৌনাচারে মেতে ওঠা নিতান্তই সভ্যতার পরিপন্থি। অবিবাহিত তরুণ-তরুণীর ভালোবাসা দিবস উদযাপনের নামে যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি অনুকরণ করছে তা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ ও হারাম। বিয়ের আগে এ ধরনের প্রেম-ভালোবাসা ইসলামের নীতি ও আদর্শবহির্ভূত।
ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরন করবে, সে ব্যাক্তি সে জাতিরই একজন বলে গন্য হবে। (আবু দাউদ শরীফ হাদিস নং ৪০৩১)
ভালোবাসা দিবস উদযাপনের পরিণতিভালোবাসা দিবস পালনের নামে তরুণ-তরণীরা উলঙ্গ-বেহায়াপনার উৎসবে মেতে ওঠে। এর মাধ্যমে সমাজে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও ব্যভিচারকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। আর যেই সমাজে নির্লজ্জতা ও ব্যভিচার ব্যাপক আকাড়ে ছড়িয়ে পরে সেখানে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায় এবং আল্লাহর কঠিন আজাব ও গজব অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
একজন প্রকৃত মুসলিম নারী বা পুরুষ এ ধরনের নোংরা উদযাপনে কখনও অংশগ্রহণ করতে পারে না। যারা এ ধরনের অশ্লীলতায় নেতৃত্ব দেয় এবং অংশগ্রহণ করে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা মুুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটায় তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নূর : ১৯)।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ’যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্লজ্জতা প্রকাশমান, তারা তার ব্যাপক প্রচারেরও ব্যবস্থা করে, যার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ মহামারী, সংক্রামক রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এত প্রকট হয়ে দেখা দেবে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনোই দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজা : ৪০০৯)। অতএব সমাজে অবৈধ প্রেম, পরকীয়া, অশ্লীলতা, অপসংস্কৃতি চালু রেখে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করা যাবে না।