
আইরিশ বাংলাপোষ্ট ডেস্কঃ একসময় রাজবাড়ীর মিষ্টি ও সাচি পানের সুনাম ছিল দেশজুড়ে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করা হতো বিশ্বের আট দেশে। কিন্তু করোনার সংক্রমণ ও ব্যাকটেরিয়ার দোহাই দিয়ে বন্ধ রয়েছে রাজবাড়ী থেকে পান রফতানি। যে কারণে পান চাষ করে বেকায়দায় পড়েছেন রাজবাড়ীর চাষীরা। লোকসান গুনতে গুনতে অনেকে পানের বরজ ভেঙে ঝুঁকছেন অন্য ফসল চাষে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর ৬৫৮টি মিষ্টি পানের বরজ, ১৫৬টি সাচি পানের বরজসহ ৮১৪টি পান বরজে ৮৮ হেক্টর জমিতে পানের চাষ হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার আড়কান্দি গ্রামের কৃষক সেলিম মিয়া। তিন একর জমিতে করেছেন পান চাষ। কিন্তু করোনা ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে পান রফতানি বন্ধ ও স্থানীয় দাম না থাকায় দুই বছরে তাকে লোকসান গুনতে হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। যে কারণে উপায় না দেখে ভেঙে ফেলছেন পান বরজ। শুধু সেলিম মিয়া নন, একই অবস্থা কৃষক রবিউল ইসলাম, আবদুল আওয়াল, খালেক মোল্লাসহ শত শত কৃষকের।
কৃষক খালেক মোল্লা বলেন, পান চাষে প্রচুর খরচ তার ওপর বাজারে নিয়ে বিক্রি করা যাচ্ছে না। অনেকের পান বরজে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের রোগবালাই। এ ব্যাপারে কৃষি অফিসের নেই কোনো সহযোগিতা বা পরামর্শ।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে উৎপাদিত পান এলাকার চাহিদা মিটিয়ে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, নেপাল, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ আটটি দেশে রফতানি করা হতো। এখন বন্ধ রয়েছে। রফতানির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও পান চাষে কৃষকদের নানা ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
অসময়ে বৃষ্টি, ছত্রাকজনিত নানা রোগ, কুয়াশা ও তীব্র শীতে পান পেকে যাওয়া, সার, কীটনাশক, মজুরিসহ উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং দরপতনসহ নানা কারণে দিশেহারা বাগেরহাটের পানচাষীরা।
জেলার সবচেয়ে বড় পানেরহাট ফকিরহাট উপজেলার টাউন নোয়াপাড়া। শীতে সাধারণত পানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষক সারা বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ সময় অপেক্ষা করেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া ও বিদেশে পান রফতানি বন্ধ থাকায় এ বছর পানের দামে ধস নেমেছে। বর্তমানে এক পণ (৮০টি) পান মাত্র ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত বছর ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ফকিরহাটের টাউন নোয়াপাড়া পাইকারি বাজারে বড় আকারের পানের পণ ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এবার মাত্র ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পানের দাম গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের চেয়েও কমে গেছে। অথচ খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে আকার ভেদে প্রতি পণ পানের দাম ৩০-১২০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া শীতে পেকে যাওয়ায় বড় সাইজের পান প্রতি পণ ১০ টাকা ও মাঝারি আকারের পান ৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
টাউন নোয়াপাড়া পানের বাজারের ইজারাদার মোশারেফ হোসেন ওরফে মোশা মেম্বার জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে পান রফতানি বন্ধ হওয়ায় পাইকারদের পান কেনার চাহিদা কমে গেছে। খারাপ আবহাওয়ায় বরজে পান নষ্ট হওয়ায় চাষীরা দ্রুত পান কেটে বাজারে নিয়ে আসছেন। অন্যদিকে পাইকার কম থাকায় ও জোগান বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। রোববার হাটে পান বিক্রি করতে আসা নগেন দাশ, শান্তি বাড়ৈ, রমজান শেখ, রবিউল ফকিরসহ কয়েকজন পানচাষীর সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, কিছু দিন আগে বঙ্গোপসাগারে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে অবিরাম বৃষ্টির কারণে পাতা পচা রোগ, রাইজোকটোনিয়া সোলানি ছত্রাকের আক্রমণে রুট রোট রোগ হচ্ছে বরজে। এছাড়া শীতের দাপটে পাতা পেকে যাওয়া, হলুদ দাগ রোগ, পাতা শুকিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন রোগে পান আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে প্রতিকারের জন্য সার ও ওষুধে তাদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৫০০ হেক্টর জমিতে আড়াই হাজারের অধিক ছোট-বড় পানের বরজ আছে। পান চাষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষ জড়িত। পান দ্রুত পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় কৃষক এটি সংরক্ষণ করতে পারছেন না। দাম কম হলেও বাধ্য হয়ে কৃষক পান বিক্রি করছেন। ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
ফকিরহাট বাজারের সরকারি বিসিআইসি সার ডিলার ও মেসার্স আল শাহীন ট্রেডার্সের পরিচালক মো. শাহীন আলম জানান, সরকারের দেয়া সারের দাম না বাড়লেও পান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সরিষা ও তিলের খৈলের ৭০ কেজির বস্তা ৭০০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া জিপসাম, ম্যাগনেসিয়াম সালফার, রোটন পাউডার, হিউমিক জৈব, ইমেডা ক্লোরোফিড ও জৈব সারের দাম অবস্থান ভেদে ৫-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে চাষীদের পান উৎপাদন খরচ ২৫-৩০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু দাম কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। তিনি আরো জানান, তার দোকান থেকে অনেক চাষী বাকিতে সার, ওষুধ কিনলেও ক্ষতির মুখে দেনা শোধ করতে পারছেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাছরুল মিল্লাত বলেন, পানচাষীরা বহুমূখী সংকটে রয়েছেন। বাজারে পানের ভালো দাম পেলে তারা বৈরী আবহাওয়াজনিত বরজের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারতেন।
মাগুরায় গত বছর পানচাষীরা লাভবান পেলেও এ বছর উৎপাদন খরচই উঠছে না, অভিযোগ চাষীদের।
শ্রীপুর উপজেলার মোর্ত্তজাপুর গ্রামের পানচাষী ওহিদ খান জানান, গত বছর পানের চাহিদা বেশি ছিল তাই বিভিন্ন স্থানের পাইকার এ জেলায় এসে পান কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু এ বছর জেলায় পানের বাজার খুবই খারাপ থাকায় আমাদের উৎপাদন খরচই উঠছে না ।
একই গ্রামের অন্য পানচাষী ফিরোজ মাহামুদ বলেন, গত বছর ভালো পানের দাম ছিল প্রতি পণ ৭০-৮০ টাকা, মাঝারি সাইজের পান ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এ বছর পানের চাহিদা কম থাকায় দামও মিলছে না। বাজারে ভালো মানের এক পণ পান আমরা পাইকারি ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি করছি। আর মাঝারি সাইজের পান ১৫-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না। তাই চাষ থেকে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হায়াৎ মাহমুদ জানান, চলতি বছর জেলায় মাত্র ১০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। যদি পান চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ে তবে কৃষি বিভাগ তাদের যথাযথ পরামর্শ ও সহযোগিতা করবে।
দীর্ঘদীন পানের চাষ ধরে রেখেছেন নড়াইলের চাষীরা। চলতি বছর দাম অর্ধেকে নেমে আসায় অনেক চাষী পান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কৃষকের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চলতি বছর পানের বাজারমূল্য অর্ধেকে নিয়ে এসেছেন। এভাবে চলতে থাকলে অল্প দিনের মধ্যে একে একে সব পানচাষী অন্য ফসল আবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বেন।
চাষীরা জানান, গত মৌসুমে এক পণ পান আকারভেদে ৫০-১৮৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করেছেন তারা। চলতি মৌসমে সে পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০-৮০ টাকা দরে।
নড়াইল পৌর এলাকার উজিরপুর গ্রামের পানচাষী সুশান্ত পাল (৭০) বলেন, তাদের গ্রামের চাষীরা শত বছর ধরে পান চাষ করেন। তিনি নিজেও ৫০ বছরের বেশি সময় এ চাষ করেন। পানের দাম কমে যাওয়ায় তার আশপাশের ১০-১২ জন কৃষক পানের বরজ তুলে (ভেঙে) ফেলে অন্য ফসলের চাষ করছেন।
চাষী মনোরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, যে দামে পান বিক্রি করতে হচ্ছে তা দিয়ে উৎপাদন খরচও উঠছে না। কষ্ট করে পানের আবাদ করি আমরা (চাষীরা) আর লাভ যায় ব্যবসায়ীদের পকেটে।