দ্রুত ইফতার করা গুরুত্বপূর্ণ আমল

আইরিশ বাংলাপোষ্ট অনলাইন ডেস্কঃ সেহেরির মতো ইফতারও রোজার গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম অনুষঙ্গ। রোজা সমাপ্ত করার উদ্দেশ্যে সূর্যাস্তের পরে পানাহার করাকে ইফতার বলে। আর এ পানাহার সামগ্রীকে বলে ইফতারি।

সারাদিন রোজা রাখার পর, আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকার পর যখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পানাহারের অনুমতি মেলে তখন মানুষের মধ্যে যে আনন্দ ও খুশির জোয়ার উঠে তার প্রকাশ ভাষায় সম্ভব না, এটা শুধুমাত্র উপলব্ধির বিষয়। ইফতারের এ জান্নাতি আনন্দে সারাদিনের কষ্টের কথা সবাই বেমালুম ভুলে যায়। আর হৃদয়ে গেঁথে থাকে প্রভুকে খুশি করার এক অবর্ণনীয় তৃপ্তি। কোনো অমুসলিমও যখন মুসলমানদের ইফতার মাহফিলে উপস্থিত থাকেন, ইফতারের এ আনন্দঘন এ পরিবেশ তাকে উৎফুল্ল করে, মুগ্ধ করে।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, বান্দা রোজা রাখে আমার জন্য। সে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা ও পানাহার আমার জন্য বর্জন করে। তাই এর পুরস্কার আমি নিজে দেব। রোজা হলো জাহান্নামের শাস্তির ঢাল। রোজাদারের জন্য দু’টি খুশি। প্রথমটি ইফতারের খুশি। দ্বিতীয়টি আমার সাথে সাক্ষাতের খুশি। -সহিহ বোখারি: ৭৪৯২

সূর্যের গোলক সম্পূর্ণ অদৃশ্য হলেই ইফতারের সময় হয়ে যায়। আর ইফতারের সময় হলে বিলম্ব না করে দ্রুত ইফতার করাটা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি অহেতুক বিলম্ব করে অথবা অন্ধকার হওয়ার অপেক্ষা করে অথবা আরো অধিক সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে পানাহার বর্জনের সময়কাল বাড়ানোর জন্য ইফতারকে বিলম্বিত করে তবে সে গোনাহগার হবে। এমনকি তার রোজা মুসলমানদের রোজা থাকবে না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দ্বীন ততোদিন পর্যন্ত ঠিক থাকবে, যতদিন পর্যন্ত মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। কেননা, ইহুদি-খ্রিস্টানরা বিলম্বে ইফতার করে। -সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৫

বিলম্বিত ইফতারে কোনো সওয়াব নেই, বরকতও থাকে না। কেননা, নবী করিম (সা.) বলেছেন, মানুষ কল্যাণের ওপর থাকবে যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে। -সহিহ বোখারি: ১৯৫৭

ইফতারির জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাদ্য বা পানীয়কে ইসলাম অবধারিত করেনি, জরুরি করেনি। নিজের খাদ্যাভ্যাস, রুচি ও সামর্থ্য অনুপাতে যে কোনো খাদ্য ও পানীয় দিয়েই ইফতার করার সুযোগ আছে। তবে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতারের জন্য খেজুর ও পানিকে সর্বাধিক পছন্দ করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখবে তখন সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। যদি খেজুর না থাকে তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি পবিত্রতা আনায়ন করে। -সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৭

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস বলতে যেয়ে তার প্রিয় খাদেম হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের নামাজ পড়ার আগে পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি পাকা খেজুর না থাকতো তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। আর যদি তা-ও না থাকতো তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করতেন। -সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৮

ইফতারের পূর্বের সময়টা অতি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ এক সময়। এটা দোয়া কবুলের মোবারক সময়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যখন সে ইফতার করে ও নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া। -ইবনে মাজাহ: ১৭৫২

তিনি আরও বলেছেন, ইফতারের সময় রোজাদের ন্যূনতম একটি দোয়া অবশ্যই কবুল হয়। -সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩

তাই ইফতারে বেশ আগে থেকে ইফতারি নিয়ে বসে দোয়া-মোনাজাতে মশগুল থাকা দরকার। ইফতারির আয়োজনে ব্যস্ত থেকে অনেকেই এ মোবারক সময়ের দোয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে। বিশেষত বাসা-বাড়ির মহিলারা পুরুষদের জিহ্বার স্বাদ পূরণ করতে যেয়ে হরেক-রকমের বাহারি আইটেমের ইফতারি তৈরিতে ঘরের নারীদের এতটাই ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করে যে, ইফতারের পূর্ব সময়ে তারা আর দোয়া-মোনাজাতের সময় পান না। এটা শুধু সেই নারীর জন্য নয় তার পুরো পরিবারের জন্য বঞ্চনার কারণ। হতে পারে একজন নারীর এ সময়ের দোয়া তার ও তার পরিবারের সবার জন্য প্রভুত খায়র ও বরকতের কারণ হবে। তাই বাড়ির কর্তাদের কর্তব্য বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া। নারীদের দোয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

আর ইফতারের জন্য ভুরিভোজের মহাআয়োজন যা মানুষের পাশবিকতা ও প্রবৃত্তিকে অধিক জাগিয়ে দেয় এবং বাহ্যদৃষ্টে মনে হয় বেশি পরিমাণে দামি দামি খাবার খাওয়ার জন্যই যেন এ রোজা রাখা এটা ইসলামি চেতনার সঙ্গে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসৃত সুন্নাহর সাথে, সর্বোপরি রোজার উদ্দেশ্যের সাথে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেকেই অধিক পরিমাণে আর অধিক আইটেমের ইফতার করতে করতে মাগরিবের জামাতে পর্যন্ত উপস্থিত হতে পারে না। এটা নেহায়ই গর্হিত কাজ। জামাতে শরিক হওয়া পুরুষের জন্য ওয়াজিব।

সময় হলে বিসমিল্লাহ বলে ইফতার করতে হয়। কিছু ইফতারি খাওয়ার পর বলতে হয়-

اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।

অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার জন্য রোজা রেখেছি আবার তোমার দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করেছি। -সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬০

ইফতারি শেষ করার পর বলতে হয়-

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: জাহাবায যামাউ, ওয়াব-তাল্লাতিল উরূকু, ওয়া সাবাতাল আজরু- ইনশাআল্লাহ।

অর্থ: পিপাসা নিবারিত হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলো সতেজ হয়েছে। আল্লাহ চাহেন তো রোজার সওয়াবও লেখা হয়েছে। -সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৯

SHARE THIS ARTICLE