টিকলি

কবি ও কথাসাহিত্যিক রহমান ফাহমিদাঃ আজ রাকিব সাহেবের একমাত্র মেয়ে তাহমিনা শারমিন লাবনীর বিয়ে।রাকিব সাহেব একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।বাড়িতে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব মিলে লোকজন ভরপুর!ছোট বড় সকলে নানারকম সাজে সেজেছে।চারিদিকে সাজ-সাজ রব।লাল,নীল,হলুদ আলোকসজ্জায় বাড়িটাকেও অপূর্ব লাগছে।বিয়ের সাতদিন আগের থেকে বাড়িসহ বাড়ির সামনের রাস্তা,নানারকম আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে।গেট সাজানো হয়েছে পরপর তিনটি।বাড়ির সামনে বিশাল জায়গা,সেই জায়গায় প্যান্ডেল টাঙ্গিয়ে বরযাত্রিসহ মেহমানদের বসার জায়গা করা হয়েছে।সিলেটের বনেদী পরিবারের সদস্য তাঁরা তাই নিজ বাড়িতেই বিয়ের আয়োজন করেছেন।দুই পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কারণে পারিবারিকভাবেই বিয়ে ঠিক করা হয়।বর আরমান আহমেদ লন্ডনে থাকে।বিয়ে করে বউ নিয়ে লন্ডন চলে যাবে।বর যাত্রীও এসে পড়েছে।সবকিছুই ঠিকঠাক মত চলছিল কিন্তু বাধা হয়ে দাড়িয়েছে একটি ‘টিকলি’।কারণ বরযাত্রী সবকিছু ঠিকঠাক মত নিয়ে এসেছে কিন্তু বাড়ি থেকে ‘টিকলি’ আনতে ভুলে গেছে।এদিকে লাবনীর একমাত্র ফুফু ভীষণ রেগে গেছেন ‘টিকলি’ না আনার কারণে।তিনি মনে করেন বরের কাছ থেকে পাওয়া টিকলি মাথায় পড়ে বাবার বাড়ি থেকে যাওয়া একটি মেয়ে বা বউয়ের জন্য বিশাল সম্মানের ব্যাপার!এটা ছাড়া বিয়ে হওয়া সম্ভব না,তিনি তা বলে দিলেন।পরিবারের সবাই তাঁকে বুঝালেন যে,টিকলি বউভাতের সময় বরের বাড়ি থেকে পড়ে নিবে।এখন যেহেতু ভুল হয়ে গেছে তখন আর কি করা!রাকিব সাহেবের স্ত্রী বললেন,বুবু আজকে না হয় আমার টিকলি পড়ে যাক।আমার তো বিয়েরটা ছাড়াও দুই একটা টিকলি আছে,সেটাই পড়ুক!কিন্তু লাবণীর ফুফু রাজি হলেন না।বরের বাড়ি থেকে টিকলি নিয়ে আসতে বলতে বললেন।তাদের বাড়ি তো বেশী দূরে না তাছাড়া এটা তো আর হিন্দু বিয়ে না যে,বিয়ের লগ্ন চলে যাবে!রাকিব সাহেব তাঁর বড় বোনকে অনেক সম্মান করতেন।তাঁর ওপরে কোনো কথা বলতেন না।তাই কি আর করা!বরের বাবা লোকমান আহমেদ তাঁর বন্ধু মানুষ তাঁকে বুঝিয়েসুঝিয়ে ‘টিকলি’ বাড়ি থেকে আনিয়ে নিতে বললেন।তখন লোকমান সাহেব বরের ছোট ভাই ও মামাকে ‘টিকলি’নিয়ে আসার জন্য তাঁদের বাড়ি পাঠালেন।সেই সময় লাবনীর ফুফু সাদিয়া আফরিন খেয়ালী নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।কেউ আর তখন তাঁকে বিরক্ত করল না কারণ সবাই জানে অতিরিক্ত রাগের কারণে তাঁর মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে,একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।খেয়ালী ঘরে দরজা বন্ধ করে খাটে এসে শুয়ে পড়ল।আর ভাবতে লাগলো,এই ‘টিকলি’নিয়ে তাঁর নিজের জীবনে কতইনা ঘটনা আছে!সেই সব ঘটনা এখন তাঁর মনে আনাগোনা করছে।তাই সে এক একটি ঘটনা ভাবতে বসলেন।ছোটবেলা থেকেই টিকলি তাঁর ভীষণ পছন্দের ছিল।আর এখন তাঁর বিয়ের পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন কারণ পর্যবেক্ষণ করে তিনি মনে করেন, ‘টিকলি’ একটি মেয়ের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহন করে।তাই তিনি তাঁর ভাতিজীর বিয়েতে ‘টিকলি’-কে এত গুরুত্ব মনে করছেন!তিনি বাবা মায়ের অনেক আদরের মেয়ে ছিলেন।বাবার বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই সে নিজের খেয়াল খুশীমত বড় হয়েছেন।হয়তো তাঁর নামটা খেয়ালী সেই কারণে তাঁর নামের প্রভাবেও হতে পারে।অনেক সময় গুরুজনদের বলতে শুনেছেন যে,সব মানুষের জীবনেই নামের প্রভাব পড়ে!তাই তো আকিকার সময় বুঝেসুঝে নাম রাখতে হয়।খেয়ালীর মায়ের ঘরে বড় করে বাঁধাই করা বাবা মায়ের বিয়ের ছবি আছে।ঐ ছবিতে মাথায় ঘোমটা পড়ে ‘টিকলি’ দিয়ে বউ সেজে আছে মা!ছবিতে এত সুন্দর লাগছে মাকে,ছোটবেলায় সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো!মা তখন বলতো তোকেও বিয়ের সময় এভাবে সাজিয়ে দিব।খেয়ালীর যখন ৩/৪ বছর বয়স তখন একটি পারিবারিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ওকে বউ সাজিয়ে ষ্টেজের মাঝখানে বসিয়ে সবাই ওর চারিপাশে ঘুরে ঘুরে বিয়ের গানের সাথে নাচ করেছে।ওকে বলেছে চোখ বন্ধ করে থাকতে আর ও চোখ বন্ধ করে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।যখন ওকে সবাই ডেকে তুলল তখন ও সাথে সাথে মাথায় হাত দিয়ে দেখল,টিকলিটি নাই কারণ যার টিকলি পড়ানো হয়েছিল,সে খুলে নিয়ে গেছে।আর ওর সেকি কান্না।আরেকটু যখন বড় হল,ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ে তখন দর্জির কাছ থেকে সাদা কাপড়ের টুকরা সংগ্রহ করে সেই কাপড় দিয়ে পুতুল বানাতো।শলার কাঠি দিয়ে হাত বানাতো,সাইন পেন দিয়ে চোখমুখ একে দিত।আলতা দিয়ে ঠোঁট লাল করে দিত পুতুলের।পুতুলের চুল বানানোর জন্য অনেক ঝক্কি পোহাতে হত!কারণ মায়ের বেণীর টারসেল চুরি করে কাঁচি দিয়ে কেটে পুতুলের চুল বানাতো।মা,ধরতে পারলে তখন অনেক বকাঝকা খেতে হতো পুরনো টারসেল হলে,আর যদি কোনোদিন ভুল করে নতুন টারসেল কেটে ফেলেতো তবে মা আর আস্ত রাখতেন না!খুব মারতেন।ছোটবেলায় একবার সে তাঁর বান্ধবীর সাথে পুতুল বিয়ে দিয়েছিল।যে বান্ধবীর সাথে পুতুল বিয়ে দিয়েছিল তার নাম ছিল সোহানা লিটা।ও লিটা করেই ডাকত।দুজনের সেই পুতুল বিয়েতে হলুদ বৌভাত সবই হয়েছিল।আজকের এই বিয়ের মত সেদিনও বান্ধবী লিটা তাঁর পুতুল ছেলের বউয়ের জন্য ‘টিকলি’ আনতে ভুলে গিয়েছিল।আসলে ও টিকলি বানাবে কি দিয়ে তা খুঁজে পায়নি।তখনও খেয়ালী তাঁর কোনো কথাই শুনে নাই এবং বলেছিল,’টিকলি’ ছাড়া তাঁর পুতুল মেয়েকে বিয়ে দিবে না।তারপর লিটাকে রিতিমত বাসায় পাঠিয়ে টিকলি আনিয়েছিল।লিটা ওর মায়ের ইমিটিশনের মালা থেকে পুঁতি ছিড়ে টিকলি বানিয়ে এনেছিল।তখনকার ঘটনা ভেবে মাঝে মাঝে হাসি পেলেও এখন এই টিকলিটাকে বৌয়ের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।ও যখন বড় হল এবং কলেজ লাইফ শেষের পথে সেই সময় ওর প্রিয় দুই বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেল।তখন তো ব্যাঙের ছাতার মত এত পার্লার ছিলনা!তাই আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবী মিলেই বউ সাজাতো।খেয়ালীর দুই বান্ধবীর বিয়ের সময় খেয়ালীর ওপর বউ সাজানোর দায়িত্ব পড়েছিল।তখন স্নো পাউডার মিলিয়ে সারামুখে ফোঁটা ফোঁটা করে সাজাত আর কপালের মাঝখানে বড় একটা টিপ পড়িয়ে দিত।খেয়ালীর আবার এভাবে বউ সাজা পচ্ছন্দ হতো না।ও অপেক্ষা করতো,কখন টিকলি পড়াবে!কারণ ওর মনে হত,এটা একটি মেয়ের অহংকার,সম্মান ও তাঁর আত্মমর্যাদা এবং সমস্ত আবেগ ঐ টিকলিতেই নিহিত থাকে।যেমন হিন্দুদের মাথার‘সিঁদুর’,খ্রিষ্টানদের’ক্রাউন’তেমনি মুসলমানদের মাথায় ‘টিকলি’!এই ‘টিকলি’ পড়িয়েই একটি মেয়েকে বাবার বাড়ি থেকে সম্মান দিয়ে স্বামী তাঁর বাড়িতে নিয়ে যায়।খেয়ালী যখন কলেজে পড়ে তখন সে,সব সময় মনের অগোচরে রুনা লায়লার সেই গানটি গাইত,’ও বন্ধুরে/প্রাণও বন্ধুরে/কবে যাব তোমার বাড়ি/পিন্দিয়া গোলাপি শাড়ি/টিকলি মাথায়/ঘোমটা দিয়ারে’!দুঃখের বিষয় ছোটবেলা থেকে খেয়ালী যা সবসময় স্বপ্ন দেখেছে এবং সম্মান ভেবেছে তা থেকেই সে বঞ্চিত হয়েছে চিরদিনের জন্য।কারণ তাঁর বিয়েটা হয়েছিল নিজের ইচ্ছায়।একটি জেদের বশবর্তী হয়ে।ছেলেটির কিছু না জেনে,না দেখে হুট করেই বিয়েটা হয়ে গেল!মাত্র একটি আংটির বিনিময়ে,কাবিনের অর্ধেক টাকাই উশুল হয়ে গেল।ভুল!বড় ভুল ও মিথ্যা দিয়েই শুরু হল খেয়ালীর জীবন।পরবর্তীতে অনেকেই সান্তনা দেয়ার জন্য বলেছে বিয়েটা ভাগ্যের ব্যাপার!আল্লাহ’র হাতেই তো সব জন্ম,মৃত্যু ও বিয়ে।বিয়ের পর কোনো সম্মান তো পায়ই নাই বরং অত্যাচার,অপমান সহ্য করতে হয়েছে ওর সারাটি জীবন।তাই তো যখনই অত্যাচারিত হয়েছে তখনই ভেবেছে,সে তো মাথায় ‘টিকলি’ পড়ে সম্মানের সাথে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি আসেনি।তাহলে কি করে স্বামী আর শ্বশুর বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে সে সম্মান আশা করে!বিয়ের পর ইনিয়েবিনিয়ে অনেকবার স্বামীকে বলেছে,তুমি তো আমাকে একটি ‘টিকলি’ দিলেনা!টিকলিটা যে খেয়ালীর খুব পচ্ছন্দ এটা স্বামী বুঝে ফেলেছিল এবং ‘টিকলি’ দিলে বৌকে সম্মান দেয়া হবে তা হয়তো বুঝে ফেলেছিল!তাই তো এই সম্মান দিলে,যখন তখন খেয়ালীর ওপর টর্চার করতে বাঁধবে!সেই কারণে হাতের বালা,জড়োয়া সেট কিনে দিয়েছে কিন্তু ‘টিকলি’ আর কিনে দেয়নি সে।ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!এখন সে যে কোনো বউয়ের সম্মান ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ‘টিকলি’ নিয়ে ফাইট করে।আজকে তাঁর ভাতিজীর বিয়েতেও এর ব্যতিক্রম হলোনা।এমন সময় রাকিব সাহেব ও তাঁর স্ত্রী এসে বলল,বুবু চলেন!ওরা ‘টিকলি’ নিয়ে এসেছে,আপনি লাবনীকে পড়িয়ে দিবেন।খেয়ালী বলল,আমি কেন!ওর শাশুড়ি পড়িয়ে দিবে।লাবনীর শাশুড়ি রাকিব সাহেবদের পেছনেই ছিল।সে রাকিব সাহেবের স্ত্রীর কাছে সব আগেই শুনেছেন তাই সে বলল,না আপা,আপনি পড়িয়ে দিবেন।সবার অনুরোধে খেয়ালী লাবনীর মাথায় ‘টিকলি’ পড়িয়ে দিল সেই সাথে একটি বিজয়ের দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল মনের অজান্তে।খেয়ালী দেখল, ‘টিকলিটা’ লাবনীর মাথায় তাঁর আত্মমর্যাদার সম্মান নিয়ে জ্বলজ্বল করছে।

SHARE THIS ARTICLE