দুধ দিয়ে ভন্ড পীরের ধোয়া পায়ে চুমু খাচ্ছেন ভক্তরা

সিয়াম আবদুল্লাহ, কুষ্টিয়া থেকেঃ নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত কোনোটারই প্রচলিত নিয়ম সঠিক নয়! ভুল আছে মসজিদে। তাই অনুসারীদের আসতে হবে নিজের বাঁশ বাগানের দরবারে। সেখানেই নামাজ আদায় করতে হবে। এমনকি পালন করতে হবে হজও। শুধু তাই নয়, দুধ দিয়ে কথিত এ পরীরে পা ধুয়ে চুমু খেতে হবে নারী-পুরুষদের।

এমনই এক ভণ্ড পরীরের সন্ধান মিলেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। কথিত এ পীরের নাম শামীম। কয়েকদিন আগেই এক মুসলিম কিশোরকে ঢাকঢোল বাজিয়ে ‘হরে শামীম’ উলুধ্বনি দিয়ে দাফন করেছেন ভণ্ড এ পীর।

অবিলম্বে এসব ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধের পাশাপাশি ভণ্ড শামীমের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এমপি, ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকার মানুষ।

দৌলতপুরে শামীমের নানা অস্বাভাবিক-অসংগতিপূর্ণ কাজের ভিডিও আর ছবি ফেসবুকে এখন ভাইরাল। তবু বহাল তবিয়তে নিজের মনগড়া ধর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের শামীম।

বিভ্রান্তিকর রটনা আর অসংগতিপূর্ণ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এলাকায় সৃষ্টি হওয়া চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির অনুসন্ধানে যান চিত্রসাংবাদিক হাবিবুর রহমান ও রিপোর্টার সিয়াম আবদুল্লাহ। এ সময় সংবাদ সংগ্রহে বাধার শিকার হন তারা।কথিত পীর শামীম রেজা

কথিত পীর শামীম রেজা

কথিত গুরুদেব শামীমের ডেরায় ঢুকতে শুরুতেই জুতা খুলে খালি পায়ে হেঁটে যেতে হয় দুইশ গজের পথ। সাংবাদিকদের প্রবেশ দেখে মিনিট খানেকের মধ্যে হাজির হন পাঁচ থেকে সাতজন তরুণ এবং আট-দশজন নারী। অনুমতি সাপেক্ষে নিজের জীবনযাপনের ব্যাখ্যা চাওয়া হয় শামীমের কাছে।

তখনই তিনি জানিয়ে দিলেন, বিশ্বব্যাপী চলা ইসলাম ভুল নিয়মে চলছে, তিনি যে দর্শনচর্চায় জীবনযাপন করছেন সেটিই ইসলামের সঠিক রূপ। যে রূপে সন্ধ্যা হলে নারী-পুরুষের নাচ-গান (স্থানীয়দের দাবি অশ্লীল নাচ-গান), ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফন, হরে শামীম উলুধ্বনি, শামীমের পায়ে সিজদাহ, দুধ দিয়ে পা ধুয়ে ভক্তি চলে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের প্রচলিত ধর্মীয় কানুন আর কোরআনের নির্দেশকে সরাসরি ভুল বলে দাবি করছেন কথিত এ পীর।

আলাপচারিতা শেষে এলাকাবাসীর বক্তব্য নেয়ার সময় শামীমের ডেরায় চিত্রসাংবাদিক হাবিবের ওপর হঠাৎ চড়াও হন এক তরুণ। এ সময় সংবাদকর্মীরা পরিচয় জানতে চাইলে দ্রুত সটকে পড়েন তিনি।

এছাড়া সাংবাদিকদের ওপর সার্বক্ষণিক কড়া নজর রাখেন আট-দশজন তরুণ। গুরুদেব শামীমের জীবনযাপন সম্পর্কে স্থানীয়রা চাঞ্চল্যকর তথ্য দিতে শুরু করলে চড়াও হন ওই তরুণরা। পরে ক্যামেরা দেখে সটকে পড়নে তারা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো ভিডিও এবং ছবি ভাইরাল হলে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এলাকাবাসী। এরপর এক সন্ধ্যায় ফিলিপনগর দারোগার মোড় এলাকায় নিজেদের লোকজন নিয়ে শোডাউন দেন শামীম।

মুঠোফোনে ধারণ করা দুই মিনিট এক সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, ভণ্ড শামীম আয়েশি ভঙ্গিতে ফুলের মালা গলায় দিয়ে চেয়ারে বসে আছেন। চারদিক থেকে তাকে ঘিরে রেখে নারী-পুরুষরা নেচে-গেয়ে ‘হরে হরে, হরে হরে, হরে শামীম, হরে শামীম’ বলে সবাই চিৎকার করছেন। একটি বড় গামলায় দুই পা দিয়ে রেখেছেন শামীম। আর ভক্তরা দুধ দিয়ে তার পা ধুয়ে দিচ্ছেন, কেউবা চুমু খাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার হামাগুড়ি দিয়ে পায়ে মাথা ঠুকে তাকে সিজদা করছেন।

এর আগে ১৬ মে রাতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের মহাসিন আলীর কিশোর ছেলে আঁখি। মহাসিন আলী কথিত ভণ্ড পীর শামীমের অনুসারী হওয়ায় ছেলের লাশ তার হাতে তুলে দেন। ওইদিন রাতে অনুসারীদের নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে নেচে-গেয়ে আঁখিকে দাফন করেন শামীম।খাবারের সামনে শামীম

খাবারের সামনে শামীম

সংশ্লিষ্ট এলাকার মুসলিম ও ইসলাম ধর্ম প্রসঙ্গে জানাশোনা ভালো এমন ব্যক্তিরা ঘুরছেন উপজেলা প্রশাসন আর দৌলতপুর পুলিশের দ্বারে দ্বারে। তবে এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নন দৌলতপুর থানার ওসি নাসির উদ্দিন।

নেচে-গেয়ে, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে দাফন করা থেকে শুরু করে একের পর এক ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন ইসলামপুর গ্রামের মানুষ। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

স্থানীয়রা জানায়, শামীমের ভক্ত-অনুসারীদের বেশিরভাগই অল্প বয়সী তরুণ-তরুণী। শামীম নিজে এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অনুসারী অশিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত মানুষজনকে মগজ ধোলাই করে শিষ্যত্ব লাভে বাধ্য করেন। প্রায় দুই বছর ধরে তার আস্তানায় ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চললেও মূলত ১৬ মে আাঁখি নামের কিশোরের লাশ ঢোল-তবলা বাজিয়ে দাফন করার পর থেকে শামীম সবার আলোচনায় চলে আসেন।

কথির পীর শামীমের পুরো নাম শামীম রেজা। তিনি একই এলাকার জেসের মাস্টারের ছেলে। তার বড় ভাই শান্টুও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। শামীম ছিলেন পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৮৪ সালে ফিলিপনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করে পরবর্তীতে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম পাস করেন।

পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার জিনজিরা এলাকায় একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম রেজা। পরবর্তীতে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং খাদেম হিসেবে সেখানে থাকতে শুরু করেন। কথিত পীর গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হওয়ার পর থেকে শামীম পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শামীমের সন্ধানে ব্যর্থ হন।

২০০৭ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শামীম। কিন্তু সে বিয়ে দুই-তিন মাসের বেশি টেকেনি। প্রায় বছর দুয়েক আগেই হঠাৎ শামীম নিজ গ্রাম ইসলামপুর ফিরে আসেন এবং নিজ বাড়িতেই আস্তানা গড়ে তোলেন।

এ প্রসঙ্গে শামীমের ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান (সান্টু মাস্টার) বলেন, যত দ্রুত সম্ভব তাকে বিচারের আওতায় নেয়া উচিত। তার কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ।

দৌলতপুরের ইউএনও শারমিন আক্তার বলেন, শামীমের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড জানার পর আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সর্তক করে দিয়েছি। এ ব্যাপারে কেউ তার বিরুদ্ধে লিখিত কোনো অভিযোগ দেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দৌলতপুর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা বলেন, শামীমের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

SHARE THIS ARTICLE